শায়লা জাহান
`মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেও শিশুটি হেসে খেলে বেড়াচ্ছিলো। হঠাৎ করেই শুরু হলো বারবার পাতলা পায়খানা। সাথে যোগ হয় বমি আর খাবারে অনীহা।'- একটি শিশু এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলে যেকোন বাবা-মা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সন্তান অসুস্থ হওয়ার মতো এমন অসহায় অবস্থা পৃথিবীতে যেনো আর দ্বিতীয়টি নেই। তবে এই সময়ে প্যানিক বা আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত মাথায় সঠিক পদক্ষেপ নিলে ঘরে বসেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া একটি চিন্তার কারণ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ডায়রিয়া হলো তৃতীয় প্রধান কারণ। প্রতি বছর প্রায় ৪,৪৩,৮৩২ টি শিশুর মৃত্যুর জন্য এটি দায়ী। দিনে তিন বা তার বেশিবার পাতলা বা তরল মল ত্যাগ করাকে ডায়রিয়া হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। তবে স্বাভাবিক আকৃতির মল ঘনঘন ত্যাগ করাকে ডায়রিয়া বলা যায় না। একইভাবে, বুকের দুধ পান করা শিশুদের ক্ষেত্রে পাতলা বা আঠালো মল ত্যাগ করাও ডায়রিয়া নয়। সঠিকভাবে যত্ন নিলে এটি সাধারণত ১ বা ২ দিন স্থায়ী হয়ে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে ডায়রিয়া যদি ২ দিনের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তবে আপনার শিশুর হয়তো আরও গুরুতর কোন সমস্যা থাকতে পারে। ডায়রিয়া দুই ধরনের হতে পারে-
যে ডায়রিয়া ১ বা ২ দিন স্থায়ী হয় এবং নিজে থেকেই সেরে যায়। এটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত খাবার বা পানির কারণে হতে পারে। অথবা কোনো ভাইরাসের সংক্রমণের কারণেও আপনার শিশু এতে আক্রান্ত হতে পারে।
আরেকটা হচ্ছে ক্রনিক। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে। এটি অন্য কোন স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে হতে পারে। যেমন, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম। এছাড়া অন্ত্রের কোনো রোগের কারণেও এটি হতে পারে। যেমন- আলসারেটিভ কোলাইটিস, ক্রনস ডিজিজ বা সিলিয়াক ডিজিজ।
ডায়রিয়া হওয়ার কারণ
ডায়রিয়া বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে-
ভাইরাস বিশেষ করে রোটাভাইরাস ও নোরোভাইরাস এর সংক্রমণ, এটাই সবচেয়ে সাধারণ কারণ
দুষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
খাওয়ার আগে হাত না ধোয়া বা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়
কিছু শিশুর ল্যাকটোজ বা নির্দিষ্ট কিছু খাবার হজমে সমস্যা থাকলে ডায়রিয়া হতে পারে
কিছু অ্যান্টিবায়োটিক অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করে ডায়রিয়া ঘটাতে পারে
শিশুর ডায়রিয়ার লক্ষণ
প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে-
ঘনঘন ও তরল মল ত্যাগ
পেটে ব্যথা বা মোচড় দেয়া
পেটে অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব
জ্বর বা শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া
খাবারের প্রতি অরুচি
শিশুর পানিশূন্যতা
ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এটি হলে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন লবণ বেরিয়ে যায়। অতীতে, ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল তীব্র পানিশূন্যতা ও শরীর থেকে তরল বের হয়ে যাওয়া। আর শিশু ও ছোট বাচ্চাদের পানিশূন্যতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই আপনার সন্তানের শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে কিনা তা বোঝা জরুরী। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
মুখ, জিহবা ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া
চোখ বসে যাওয়া
নিস্তেজ বা খিটখিটে মেজাজ
স্বাভাবিকের চেয়ে কম প্রস্রাব করা বা ন্যাপি ভেজা
মাথা ঘুরানো বা ঝিমঝিম লাগা
ক্লান্ত লাগা
কাঁদার সময় চোখের পানি কম পড়া
তীব্র পানিশূন্যতার লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
খুব কম পানি পান করা বা পান করতে অস্বীকার করা
একদম নিস্তেজ বা ঝিমিয়ে পড়া
শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
মাথার তালুর সামনের দিক (ফন্টানেল) দেবে যাওয়া
এমতাবস্থায় শরীরে পানির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা ও চিকিৎসার জন্য আপনার সন্তানকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
শিশুর ডায়রিয়ার ঘরোয়া চিকিৎসা
শিশুর বয়স,উপসর্গ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করবে তার চিকিৎসা পদ্মতি। আপনার শিশুর বয়স যদি ৬ মাসের কম হয়ে থাকে তবে সেক্ষেত্রে সবসময়ই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। আর বয়স যদি ৬ মাসের বেশি হয় এবং ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসের কারণে ডায়রিয়া হয়ে থাকে তবে ঘরোয়া চিকিৎসা দেয়া যেতে পারে। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু পানিশূন্যতাই কমন, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া তরল বা পানির ঘাটতি পূরণ করা। অনেকেই ভাবেন ডায়রিয়া হলে বাচ্চাকে বুকের দুধ বা স্বাভাবিক খাবার বন্ধ করে দিতে হবে। এটি সম্পূর্ণ ভূল ধারণা। ৬ মাসের বেশি বয়সী শিশু যারা মায়ের বুকের দুধ খায় তাদের স্বাভাবিকের চেয়ে আরও বেশি বার করে বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে। ফর্মুলা বা গরুর দুধের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। পাশাপাশি, সহজে হজমযোগ্য এমন খাবার যেমন জাউ ভাত, সাগু, কলা এমন খাবার খাওয়াতে পারেন।
প্রতিবার পাতলা পায়খানা করার পর তার বয়স অনুযায়ী পরিমাপ মতো স্যালাইন খাওয়াতে হবে। ২ বছরের কম বয়সী শিশুকে প্রতিবার ১০-২০ চা চামচ এবং ২ বছরের বেশি ব্য়সী শিশুকে ২০-৪০ চা চামচ স্যালাইন দিন। স্যালাইন একেবারে না দিয়ে চামচ দিয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ান।
স্যালাইনের পাশাপাশি শিশুকে বেশি বেশি তরল খাবার দিন। ডাবের পানি, ভাতের মাড়, চিড়ের পানি এই সময় শরীরে শক্তি যোগাতে এবং পানির ঘাটতি দূর করতে দারুণ কাজ করে। উচ্চ চিনিযুক্ত বা ঘন পানীয় দিবেন না। কারণ এগুলো ডায়রিয়া বা পানিশূন্যতার সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জিংক ট্যাবলেট ঔষধটি ডায়রিয়া হবার সময়কাল এক-চতুর্থাংশ কমিয়ে আনতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে এই জিংক ট্যাবলেট বা সিরাপটি খাওয়াতে পারেন।
কখন জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজন?
আপনার সন্তানের যদি ডায়রিয়া হয় এবং তার মলের সাথে যদি রক্ত বা শ্লেষ্মা (মিউকাস) যায়, পেটে তীব্র বা ক্রমাগত ব্যথা হলে, উচ্চ মাত্রার জ্বর হলে,উপরে বর্ণিত অতিরিক্ত পানিশূন্যতার লক্ষণগুলো দেখা দিলে, অবস্থার তেমন উন্নতি না হওয়া বা কোনো তরল খাবার খেতে না পারলে দেরি না করে সাথে সাথেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
স্বাস্থ্যবিষয়ক যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ পরিবার, সচেতন জীবন- এই বার্তাই রোদসীর অঙ্গীকার।