হ্যানয় হানাহ: যে নারী কণ্ঠকে বানিয়েছিলেন অস্ত্র

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬

হ্যানয় হানাহ। ছবি: সংগৃহীত
হ্যানয় হানাহ। ছবি: সংগৃহীত

“কেমন আছো, জিআই জো?”- প্রথমবার শুনলে মনে হতে পারে, এ যেন বহুদিনের পরিচিত কাউকে উদ্দেশ্য করে করা এক আন্তরিক সম্ভাষণ। কণ্ঠেও নেই কোনো রাগ, নেই হুমকি—আছে বরং অদ্ভুত এক শান্ত স্বর। কিন্তু এই মায়াময় কণ্ঠে পরের কথাগুলো শোনামাত্রই বদলে যায় সেই অনুভূতি। বোঝা যায়, এটি কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপের শুরু নয়; বরং রেডিওর ওপাশ থেকে ছোড়া এক মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। 


একটি কণ্ঠস্বর কতটা শক্তিশালী হতে পারে?


এতটাই, যে বন্দুকের শব্দে অভ্যস্ত একজন সৈন্যও মাঝরাতে রেডিওর পাশে বসে সেই কণ্ঠ শুনতে বাধ্য হয়। তিনি বন্দুক ধরেননি। কোনো বোমা ছোড়েননি। কিন্তু হাজার মাইল দূরের একটি রেডিও স্টেশন থেকে চেষ্টা করছিলেন আমেরিকান সৈন্যদের মনে একটি প্রশ্ন ঢুকিয়ে দিতে;


“তুমি আসলে কেন এই যুদ্ধে লড়ছ?”


হয়তোবা, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের গতিপথ বদলে যায়নি। সেই কণ্ঠে আমেরিকান সেনাবাহিনীও পুরোপুরি  ভেঙে পড়েনি। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমেরিকান সৈন্যদের মনোবল ভেংগে দিতে রেডিওর অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা এই নারী কণ্ঠস্বর একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের ময়দানে সব অস্ত্র ধাতু দিয়ে তৈরি হয় না। কিছু অস্ত্র তৈরি হয় শব্দ দিয়ে। কণ্ঠটি কোমল। অথচ তার প্রতিটি শব্দ যেন ছিল যুদ্ধের ময়দানে ছোড়া আরেকটি অস্ত্র।


এই নারীই ইতিহাসে পরিচিত হয়ে ওঠেন "হ্যানয় হানাহ" নামে।  


ত্রিন থি এনগো; যিনি ‘হ্যানয় হানাহ’ নামেই অধিক পরিচিত, ছিলেন উত্তর ভিয়েতনামের বৃহত্তম প্রচারমাধ্যম ‘ভয়েস অফ ভিয়েতনাম’-এর একজন সম্প্রচারক। ১৯৩১ সালে হ্যানয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা, ত্রিন দিন কিন ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী; ভিয়েতনামে কাঁচের সবচেয়ে বড় কারখানাটি ছিল তাঁর মালিকানাধীন।


ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি ভাষার উপর ছিলো তাঁর গভীর আগ্রহ। "গন উইথ দ্য উইন্ড"-এর মতো প্রিয় চলচ্চিত্রগুলো সাবটাইটেল ছাড়া দেখার আগ্রহ থেকেই মূলত এই ভাষা শেখার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর পরিবার তাঁকে ইংরেজি শেখার জন্য ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ১৯৫৫ সালে, ২৪ বছর বয়সে, তিনি ভিয়েতনামের বৃহত্তম বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র ‘ভয়েস অফ ভিয়েতনাম’-এ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর সাবলীল ইংরেজি উচ্চারণ, সঠিক বাচনভঙ্গি এবং সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডারের সুবাদে শীঘ্রই তিনি এশিয়ার ইংরেজি-ভাষী দেশগুলোর জন্য সংবাদ পাঠের স্থায়ী পদে নিযুক্ত হন। সেখানে তাঁর অন্যতম প্রশিক্ষক ও পরামর্শদাতা ছিলেন অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক উইলফ্রেড বারচেট। এ সময় তিনি ‘থু হুওং’ (যার অর্থ ‘শরতের সুবাস’) ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন; কারণ ভিয়েতনামি নন এমন শ্রোতাদের জন্য নামটি উচ্চারণ করা সহজ ও সংক্ষিপ্ত ছিল।


ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় রেডিও তে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হানাহ মার্কিন সৈন্যদের কাছে পরিচিত ও আলোচিত হয়ে ওঠেন। ভিয়েতনামের 'পিপলস আর্মি'-র সাথে যৌথভাবে তিনি অনুষ্ঠানের পাণ্ডুলিপি তৈরি করতেন এবং পরে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন।


ইংরেজি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ এই নারী সম্প্রচারের  মাধ্যমে দক্ষিণ ভিয়েতনামে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের উদ্দেশ্যে বার্তা পাঠাতেন এবং তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে, এই যুদ্ধ অনৈতিক; তাই তাঁদের উচিত অস্ত্র ত্যাগ করে দেশে ফিরে যাওয়া।


"যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তোমাদের অধিকাংশেরই খুব কম ধারণা আছে....কী ঘটছে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র না জেনেই যখন কাউকে যুদ্ধে পাঠানো হয়...যেখানে মৃত্যু বা আজীবনের পঙ্গুত্ব বরণ করার ঝুঁকি থাকে—তখন তার চেয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি আর কী হতে পারে!"


"তোমাদের ধনী নেতারা আরও ধনী হচ্ছে, অথচ তোমরা জলাভূমিতে প্রাণ দিচ্ছো"


এই ধরনের বক্তব্যসম্বলিত অনুষ্ঠান তিনি তাঁর সম্প্রচারগুলোর  মাধ্যমে দিনে তিনবার পরিচালনা করতেন। 


সেখানে সদ্য নিহত বা বন্দি মার্কিন সৈন্যদের তালিকা পড়ে শোনানো হতো এবং জনপ্রিয় মার্কিন যুদ্ধবিরোধী গান বাজানো হতো। হানোই হানাহ'র মূল কৌশল ছিল আমেরিকান সেনাদের ভেতর তৈরি হওয়া হোমসিকনেস বা ঘরের টানকে উস্কে দেওয়া। রেডিও সম্প্রচারের শুরুতে তিনি বাজাতেন দ্য বিটলস, বব ডিলান কিংবা তৎকালীন জনপ্রিয় আমেরিকান পপ গান। মাইলের পর মাইল দূরে থাকা তরুন সেনারা যখন সঙ্গীতের সুরে নিজেদের দেশের কথা ভেবে বিষণ্ণ হতো, ঠিক তখনই হানাহ ছড়াতেন তার কথার সম্মোহন।


শুধু তাই নয়, যুদ্ধবিরোধী মার্কিন নাগরিকদের রেকর্ড করা বার্তা সংগ্রহ করে তাও প্রচার করা হতো। পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর মতে এই বার্তাগুলোই ছিল সবচেয়ে কার্যকর, কারণ "মার্কিনরা শত্রুপক্ষের চেয়ে নিজেদের দেশের মানুষের কথাকেই বেশি বিশ্বাস করবে।"


সব সৈন্য যে তাঁর কথায় বিশ্বাস করতো তা কিন্তু নয়। সেনারা তাঁর প্রচারণামূলক বক্তব্যকে  এক ধরনের কৌতুক বা বিনোদনের খোরাক হিসেবে দেখতো এবং তা নিয়ে হাসাহাসি করত। প্রাক্তন যুদ্ধবন্দি ও সিনেটর জন ম্যাককেইন পর্যন্ত তার কণ্ঠকে "সুপার এন্টারটেইনার" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনেক মার্কিন সেনা কেবল তাঁর অনুষ্ঠানটি শুনতেন কারণ তিনি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় পপ ও রক সঙ্গীত প্রচার করতেন, যা অন্য কোথাও সহজে পাওয়া যেত না।


তবে তার ইংরেজি ছিল প্রায় নিখুঁত। রেডিওর স্টেশন খোঁজার সময় পুরুষরা হঠাৎ তার কণ্ঠস্বর শুনে আর তা এড়িয়ে যেতে পারত না। অনেকেই তার কথায় বেশ প্রভাবিতও হতো। কারণ তার কাছে থাকত নিখুঁত সব তথ্য। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ বা পেন্টাগন যুদ্ধের যে ক্ষয়ক্ষতির খবর লুকিয়ে রাখত, হানাহ রেডিওতে তা অবলীলায় বলে দিতেন। 


শুধু তাই নয়, মার্কিন বাহিনীর ভেতরের দুর্বল জায়গাগুলো খুব ভালো চিনতেন তিনি। বিশেষ করে আফ্রিকান-আমেরিকান সেনাদের উদ্দেশ্যে করা তাঁর বার্তা ছিল বর্ণবাদের বিরুদ্ধে চাবুক সদৃশ। এতে কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভেতরের বর্ণবাদ ও অসন্তোষকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।


মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হানাহ'র প্রচারণাকে 'সস্তা প্রোপাগান্ডা' বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। হাজার হাজার আমেরিকান সেনা রেডিওতে লুকিয়ে তাঁর কণ্ঠ শুনত। আমেরিকান কমান্ডারদের কাছে 'হ্যানয় হানাহ' হয়ে উঠেছিলেন এক আতঙ্কের নাম, কারণ তিনি সেনাদের লড়াই করার যে মনের জোর বা ইচ্ছাশক্তি ছিল তা ভেতর থেকে একবারে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন।


তাঁর সম্প্রচার কার্যক্রম মোট আট বছর ধরে চলেছিল। শেষ সম্প্রচারটি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে, যখন অধিকাংশ মার্কিন সৈন্য ভিয়েতনাম ত্যাগ করছিল। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয় এবং মার্কিন বাহিনী পরাজিত হয়ে ফিরে যায়। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে হানাহ কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি কি আমেরিকানদের ঘৃণা করতেন? মিষ্টি হেসে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, "না, আমি আমেরিকান সেনাদের ঘৃণা করতাম না। আমি শুধু চেয়েছিলাম তারা বুঝে দেখুক এই যুদ্ধটা অন্যায্য এবং তারা যেন ঘরে ফিরে যায়।"  


তিনি বিশ্বাস করতেন যে যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনামে সৈন্য পাঠানো উচিত হয়নি এবং দেশটির উচিত ছিল ভিয়েতনামকে নিজেদের পরিস্থিতি নিজেরাই সমাধানের সুযোগ দেওয়া।


১৯৭৫ সালে যুদ্ধের পর, এনগো তাঁর স্বামীর সাথে হো চি মিন সিটিতে চলে যান। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়েও 'ভয়েস অফ ভিয়েতনাম'-এর জন্য কাজ চালিয়ে যান। ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৮৫ বছর বয়সে হো চি মিন সিটিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাসে হ্যানয় হানাহ প্রমাণ করে গেছেন যে, যুদ্ধ জেতার জন্য সবসময় বন্দুকের প্রয়োজন হয় না। মাঝেমধ্যে এক টুকরো সত্য আর একটি ধারালো কণ্ঠস্বর, শত শত যুদ্ধবিমানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হতে পারে।

sidebar ad