যে নারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ৩২টি মানসিক হাসপাতাল

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬

ডরোথিয়া ডিক্স। ছবি: সংগৃহীত
ডরোথিয়া ডিক্স। ছবি: সংগৃহীত

মানসিক রোগ সম্পর্কে মানুষ দিন দিন অনেক সচেতন হয়ে উঠছেন। মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য রয়েছে বিশেষায়িত হাসপাতাল, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং নানা ধরনের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা। কিন্তু সব সময় পরিস্থিতি এমন ছিল না। একসময় মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষকে চিকিৎসার প্রয়োজন আছে—এমন ধারণাই সমাজে খুব একটা প্রচলিত ছিল না।


সেই অন্ধকার সময়েই একজন নারী প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এক নারী। যার নাম ডরোথিয়া লিন্ডে ডিক্স (Dorothea Lynde Dix)।


ডিক্স বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে যখন এত কিছু করার বাকি, তখন আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে আমার জন্যও নিশ্চয়ই কিছু-না-কিছু করার আছে।”—এই বিশ্বাসই তাকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছিল।


টানা প্রায় ৪০ বছর তিনি এই বিশ্বাস নিয়েই কাজ করে গেছেন। সে সময় অনেকেই বলতেন, মানসিক রোগীদের জন্য কিছুই করার নেই। কিন্তু ডিক্স এই ধারণা মানতে রাজি ছিলেন না। তিনি বলতেন, “মানুষ বলে, এখানে কিছুই করা সম্ভব নয়। আমি বলি, ‘আমার অভিধানে এমন কোনো কথা নেই।’”


তার নিরলস প্রচেষ্টা শুধু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ইতিহাসও। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বহু নতুন মানসিক হাসপাতাল গড়ে ওঠে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ প্রথমবারের মতো সম্মানের সঙ্গে চিকিৎসার সুযোগ পান। পরে মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময় তিনি ইউনিয়ন বাহিনীর জন্য নার্স নিয়োগ করেন এবং তাদের কাজের তদারকি করেন। তার এই কাজ নার্সিং পেশার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


ডরোথিয়া ডিক্স জন্মগ্রহণ করেন ১৮০২ সালের ৪ এপ্রিল, যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যের হ্যাম্পডেনে। তার ছোটবেলা ছিল অত্যন্ত কষ্টের। তার বাবা মদ্যপ ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রায়ই কঠোর আচরণ করতেন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ডিক্স-এর মা-বাবা দুজনই হয়তো বিষণ্নতায় ভুগতেন। এমনকি ডিক্স নিজেও জীবনের বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।


তবে সব কষ্টের মধ্যেও তার বাবাই তাকে পড়তে ও লিখতে শেখান। ডিক্সের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন খুব দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের চেষ্টায়ও তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। এই আত্মশিক্ষাই পরবর্তীকালে তাকে একজন দক্ষ শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


একই সঙ্গে মানুষের কষ্টের প্রতি তার মনে জন্ম নেয় গভীর সহানুভূতি। জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ ও মানুষের প্রতি এই সহমর্মিতা—দুটি গুণই পরে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।


মাত্র ১২ বছর বয়সে ডরোথিয়া ডিক্স ও তার ভাইয়েরা বাবা-মায়ের বাড়ি ছেড়ে বস্টনে তাদের ধনী দাদির কাছে চলে যান। দাদি চেয়েছিলেন, ডরোথিয়া যেন উচ্চ সমাজের একজন শিক্ষিত ও মার্জিত ভদ্রমহিলা হয়ে ওঠেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ডিক্সের মন পড়ে থাকত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের দিকে। একবার বাড়ির দরজায় ভিক্ষা করতে আসা কয়েকজন শিশুকে তিনি নিজের নতুন জামাকাপড় দিয়ে দেন। এ কারণে তাকে দাদির কাছে শাস্তিও পেতে হয়েছিল।


মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রতিষ্ঠা করেন দুটি স্কুল


ডরোথিয়া ডিক্স মাত্র ১৯ বছর বয়সেই দুটি ছোট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। একটি ছিল সচ্ছল পরিবারের মেয়েদের জন্য। অন্যটি ছিল দরিদ্র মেয়েদের জন্য একটি দাতব্য বিদ্যালয়, যেখানে বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগ ছিল।শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই তার সমাজসেবামূলক কাজের পথচলা শুরু হয়।


ইংল্যান্ডে বদলে যায় জীবনের পথ


১৮৪০ সালের দিকে ডিক্স যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। সুস্থ হওয়ার জন্য তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য ইংল্যান্ডে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি র্যাথবোন নামে একটি কোয়েকার পরিবারের অতিথি হিসেবে থাকেন। কোয়েকাররা মূলত সমাজসেবা ও মানবকল্যাণে বিশ্বাসী একটি খ্রিস্টান ধর্মীয় সম্প্রদায়। এই পরিবারের মাধ্যমে তার পরিচয় হয় অনেক ব্রিটিশ সমাজ সংস্কারকের সঙ্গে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মানসিক হাসপাতাল ও তথাকথিত ‘ম্যাডহাউস’-এর অমানবিক পরিবেশ নিয়ে কাজ করছিলেন। তাদের কাজ ডিক্সকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।


ইংল্যান্ডে কাটানো এই সময়ই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, মানসিক রোগীদের জীবন বদলাতে হলে শুধু ব্যক্তিগত সহানুভূতি যথেষ্ট নয়; সমাজ ও রাষ্ট্র—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনতে হবে।


মানসিক রোগীদের ভয়াবহ বাস্তবতা


১৮৪১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। তখন তার বয়স ৩৯ বছর। এই সময় থেকেই তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি ম্যাসাচুসেটসের বিভিন্ন কারাগার, আশ্রয়কেন্দ্র ও মানসিক রোগীদের রাখার স্থান ঘুরে দেখতে শুরু করেন। সেখানে তিনি মানসিক রোগীদের ওপর চলা ভয়াবহ ও অমানবিক আচরণ দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান।


অনেককে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। কেউ বছরের পর বছর আলো-বাতাসহীন কক্ষে বন্দি থাকতেন। চিকিৎসার পরিবর্তে তাদের শাস্তি দেওয়াই যেন ছিল নিয়ম। এই দৃশ্য দেখে ডিক্স চুপ করে থাকেননি।


আইনসভায় ঐতিহাসিক প্রতিবেদন


ডিক্স ম্যাসাচুসেটসের আইনসভার কাছে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন বা ‘মেমোরিয়াল’ জমা দেন। সেখানে তিনি মানসিক রোগীদের করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরে লিখেছিলেন, “ভদ্রমহোদয়গণ, আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই রাজ্যের সেই মানুষদের দিকে, যাদের খাঁচা, খোঁয়াড় ও অমানবিক কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাদের শিকল দিয়ে বাঁধা হচ্ছে, লাঠি দিয়ে মারা হচ্ছে এবং চাবুক মেরে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।”


তাই প্রতিবেদনটি আইনপ্রণেতাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। ডিক্সের নিরলস প্রচারণার ফলে ১৮৪৫ সালে বিষয়টি তদন্তের জন্য রাজ্যের আইনসভার দুই কক্ষের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে কমিটি জানায়, ডিক্স তার প্রতিবেদনে সমস্যাগুলো এত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে নতুন করে বলার তেমন কিছু নেই।


এটি ছিল তার জন্য একটি বড় স্বীকৃতি। তার দাবি আর একজন সমাজ সংস্কারকের ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বিবেচিত হয়নি; বরং এটি বাস্তব ও জরুরি একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সেই বছরের শেষেই মানসিক রোগীদের জন্য নতুন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিতে তার প্রস্তাব আইন হিসেবে পাস হয়। এটাই ছিল তার দীর্ঘ সংগ্রামের প্রথম বড় বিজয়।


এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে


এই সাফল্যের পর ডরোথিয়া ডিক্স আর পেছনে ফিরে তাকাননি। তার আন্দোলন ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এক অঙ্গরাজ্য থেকে আরেক অঙ্গরাজ্যে ঘুরে বেড়ান। সরকার ও আইনপ্রণেতাদের বোঝাতে থাকেন যে মানসিক রোগীদের জন্য আলাদা, নিরাপদ ও মানবিক হাসপাতাল গড়ে তোলা জরুরি।


তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ৩২টি মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ১৫টি বিদ্যালয়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য একটি বিদ্যালয় এবং নার্সদের প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন কেন্দ্র গড়ে তুলতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।


তার কাজের ফলে হাজার হাজার মানুষ প্রথমবারের মতো চিকিৎসা, আশ্রয় এবং মানবিক আচরণ পাওয়ার সুযোগ পায়।


যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তার কাজ


ডিক্সের কাজ শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি কানাডা, স্কটল্যান্ড, রাশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেন। সেখানকার মানসিক হাসপাতালগুলোর অবস্থা পরিদর্শন করেন এবং সংস্কারের পক্ষে প্রচার চালান।


এক সফরে ডিক্স পোপ নবম পিয়াসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। ডিক্সের প্রতিবেদন শোনার পর পোপ মানসিক রোগীদের জন্য একটি নতুন হাসপাতাল নির্মাণের নির্দেশ দেন বলে উল্লেখ করা হয়। এর মাধ্যমে তার কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি ও স্বীকৃতি লাভ করে।


গৃহযুদ্ধে নার্সদের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক


১৮৬১ সালে মার্কিন গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ডিক্স সেনাবাহিনীর নার্সদের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি হাজার হাজার নার্সের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও কাজের সমন্বয় করেন। তার তত্ত্বাবধানে কর্মরত নার্সরা শুধু ইউনিয়ন বাহিনীর নয়, অনেক আহত কনফেডারেট সৈনিকেরও সেবা করেন। যুদ্ধক্ষেত্রেও ডিক্স মানবতার পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন। আহত মানুষ কোন পক্ষের, তার চেয়ে তাদের চিকিৎসা পাওয়াই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।


শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম


যুদ্ধ শেষ হলে ডরোথিয়া ডিক্স আবার মানসিক রোগী ও বন্দিদের জীবনমান উন্নত করার কাজে ফিরে যান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই কাজ চালিয়ে গেছেন। তিনি একবার বলেছিলেন, “আমার মনে হয়, বিছানায় শুয়ে থেকেও আমি কিছু-না-কিছু করতে পারি।” এই কথাটি শুধু তার আশাবাদ নয়, বরং তার সারাজীবনের কর্মদর্শনেরও প্রতিফলন।


এক মানবিক বিপ্লবের নাম ডরোথিয়া ডিক্স


ডরোথিয়া ডিক্স শুধু অসংখ্য হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সাহায্য করেননি। তিনি সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন— মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষও সম্মান, সহানুভূতি এবং উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রাখে।


আজ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলা হয়, তার বিকাশের ইতিহাসে ডরোথিয়া ডিক্সের অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। একজন নারী, যিনি এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে অসহায় মানুষের পক্ষে কথা বলেছিলেন, যখন সমাজ তাদের মানুষ হিসেবেই দেখতে প্রস্তুত ছিল না।


ঢাকা/আরএস


sidebar ad