জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে নারীর কাজের বোঝা বাড়ছে। অনেক নারীকে দিনের শুরুতেই ছুটতে হয় পানি আনতে। কোথাও পানির উৎস দূরে সরে গেছে, কোথাও লবণাক্ততা বাড়িয়েছে সংকট। পানি সংগহের পর আবার ঘরের কাজ, পরিবারের দেখাশোনা, জীবিকার সঙ্গে যুক্ত কাজে যুক্ত হতে হয় তাকে। দিনের শেষে যখন অন্যরা বিশ্রাম নেয়, তখনও তার কাজ শেষ হয় না।
এ গল্প বাংলাদেশের বহু নারীর
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত ঘরবাড়ি, ফসল, আয়, বাস্তুচ্যুতি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতির হিসাব করি। কিন্তু এই হিসাবের বাইরে থেকে যায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি—সময়। একজন নারী প্রতিদিন পানি সংগ্রহে অতিরিক্ত এক ঘণ্টা ব্যয় করলে সেই এক ঘণ্টা কোথা থেকে আসে?
নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘টাইম পভার্টি’ বা সময়-দারিদ্র্যর ধারণা। জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে নারী ও সময়-দারিদ্র্যের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে, তা নিয়ে সাম্প্রতিক একটি systematic review গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সামনে এনেছে।
সময়ও যখন দারিদ্র্যের মাপকাঠি
সময়-দারিদ্র্য বলতে বোঝায় এমন পরিস্থিতি, যখন একজন মানুষের প্রয়োজনীয় কাজের চাপ এত বেশি হয় যে নিজের বিশ্রাম, শিক্ষা, আয়, সামাজিক জীবন কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে না। অর্থাৎ দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়—সময় না থাকাও এক ধরনের দারিদ্র্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন নারীর সময়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে। এর প্রধান পাঁচটি ক্ষেত্র হলো—পানি, জ্বালানি, অবকাঠামো, লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা এবং স্বাস্থ্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানি সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু পানির প্রাপ্যতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পানির উৎস দূরে সরে গেলে বা নিরাপদ পানি সংগ্রহ কঠিন হলে পরিবারের কাউকে সেই অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়। অনেক সমাজে সেই দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই নারীর ওপর পড়ে।
ফলে পানি সংগ্রহের সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় অন্য কাজের সময়। একজন নারী হয়তো সেই সময়টুকু আয় করতে পারতেন, সন্তানকে পড়াতে পারতেন কিংবা নিজের জন্য ব্যবহার করতে পারতেন। পানির সংকট তাই একই সঙ্গে সময়ের সংকট।
জ্বালানি সংগ্রহও একইভাবে নারীর সময়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি না থাকলে রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহে বাড়তি সময় ও শ্রম লাগে।
একটি পরিবারের রান্না করা খাবার তাই শুধু বাজারের খরচে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে পানি সংগ্রহ, জ্বালানি সংগ্রহ, রান্না এবং পরিষ্কারের মতো অসংখ্য অদৃশ্য কাজ।
এই কাজগুলোর বড় অংশই আবার অবৈতনিক
বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করলে নারীর দৈনন্দিন কাজের সময়ও বাড়তে পারে। বাজারে যেতে বেশি সময় লাগে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়। শিশুদের স্কুলে যাতায়াত জটিল হয়। পানি বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহে অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়।
দুর্যোগের সময় নারীর কাজ কমে না
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় একটি পরিবারের কাজ বরং আরও বেড়ে যায়। শিশুদের দেখাশোনা, বৃদ্ধ ও অসুস্থ সদস্যের যত্ন, খাবার ও পানি সংগ্রহ, ঘর সামলানো—সবকিছুর চাপ বাড়ে। কিন্তু এই বাড়তি কাজের বণ্টন সবসময় সমান হয় না। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ধারণা—রান্না, পরিচর্যা, সন্তান লালন-পালন ও ঘর সামলানো নারীর দায়িত্ব—দুর্যোগের সময়ও বহাল থাকে।
ফলে জলবায়ু পরিবর্তন পুরোনো লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবণ্টনকে আরও ভারী করে তুলতে পারে। অসুস্থ একজন, ব্যস্ত পুরো পরিবার—কিন্তু সময়টা কার? জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লে পরিবারের অসুস্থ সদস্যের যত্ন নেওয়ার দায়িত্বও বাড়তে পারে।
কেউ অসুস্থ হলে শুধু চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় সময়—হাসপাতালে নেওয়া, ওষুধ দেওয়া, খাবার তৈরি করা, পাশে থাকা, দৈনন্দিন কাজ সামলানো।
এই ‘care work’-এর বড় অংশই অনেক পরিবারে নারীরা করেন। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের একটি অভিঘাত যখন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, তার পরোক্ষ প্রভাব গিয়ে পড়ে নারীর সময়ের ওপর।
একই সময়ে পাঁচ কাজ
নারীর সময়-দারিদ্র্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো multitasking—একসঙ্গে একাধিক কাজ করা। চুলায় রান্না হচ্ছে, একই সঙ্গে শিশুকে সামলাতে হচ্ছে। ফোনে স্বামীর সঙ্গে বাজারের হিসাব করতে করতে অসুস্থ মায়ের ওষুধের কথা মনে রাখতে হচ্ছে। রান্নার ফাঁকে পানি সংগ্রহের পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
কাজের সংখ্যা শুধু বাড়ছে না, কাজগুলো একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে নারীর ওপর তৈরি হচ্ছে— বাড়তি কাজ, অতিরিক্ত চাপ, একসঙ্গে বহু কাজ, সময়ের সংকট।
জলবায়ুর সঙ্গে লড়তে গিয়েও বাড়ে সময়ের বোঝা
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পরিবারগুলো নানা ধরনের অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করে। কেউ অন্য এলাকায় চলে যায়, কেউ জীবিকা পরিবর্তন করে, কেউ নতুন আয়ের পথ খোঁজে।
অভিযোজন সবসময় সময়ের বোঝা কমায় না
পরিবারের একজন সদস্য কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেলে ঘরে থাকা নারীর ওপর সন্তান, বৃদ্ধ, ঘর ও দৈনন্দিন জীবিকার দায়িত্ব আরও বাড়তে পারে। নতুন জীবিকা শুরু করতেও বাড়তি শ্রম ও সময় প্রয়োজন হতে পারে।
তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্ভাবনাও রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সহায়তা থাকলে অভিযোজন নারীর ক্ষমতায়নের পথ হতে পারে। একজন নারী যদি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা অবৈতনিক কাজেই ব্যয় করেন, তাহলে সেই সময় তিনি আর কী করতে পারতেন?
হয়তো কোনো প্রশিক্ষণ নিতে পারতেন। হয়তো বাড়তি আয় করতে পারতেন। হয়তো নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারতেন। হয়তো পড়াশোনা করতে পারতেন। হয়তো শুধু বিশ্রাম নিতে পারতেন।
তাই সময়-দারিদ্র্য শুধু ক্লান্তির বিষয় নয়। এটি নারীর শিক্ষা, আয়, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।
সমাধান কী শুধু নারীর কাজ কমানো?
না। বরং প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যা কাজের বোঝা কমাবে এবং সেই কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যকে স্বীকৃতি দেবে। জলবায়ু ও লিঙ্গসংবেদনশীল নীতিতে গুরুত্ব পেতে পারে—
পানি ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবার সহজপ্রাপ্যতা
শ্রম ও সময় সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার
নিরাপদ ও কার্যকর অবকাঠামো
নারীর জন্য জলবায়ু-সহনশীল কর্মসংস্থান
নারীর অর্থায়ন ও ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ
অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নের কাজের স্বীকৃতি
পরিবারে কাজের দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন
জলবায়ু ও লিঙ্গ বিষয়ে সচেতনতা
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে আমরা টাকার অঙ্ক খুঁজি। কত জমি নষ্ট হলো, কত ঘর ভাঙল, কত আয় কমল—এসব হিসাব করি। কিন্তু একজন নারী প্রতিদিন যে অতিরিক্ত সময় পানি সংগ্রহে ব্যয় করছেন, অসুস্থ স্বজনের পাশে যে সময় কাটাচ্ছেন, দুর্যোগের পর ঘর সামলাতে যে ঘণ্টাগুলো চলে যাচ্ছে—সেই সময়ের হিসাব কোথায়?
আর যখন কোনো সংকট নিয়মিতভাবে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সময় কেড়ে নেয়, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে না; সেটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয় হয়ে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তন তাই নারীর কাছ থেকে শুধু নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য কিংবা জীবিকার সুযোগ কেড়ে নেয় না। অনেক ক্ষেত্রে কেড়ে নেয় তার নিজের জন্য থাকা সময়টুকুও।
সেই হারানো সময়ের মূল্য বুঝতে পারাই হতে পারে জলবায়ু ন্যায্যতার আরও পূর্ণাঙ্গ হিসাবের প্রধান ধাপ।