একটি দেশের সভ্যতা বিচার করতে হলে তার আকাশচুম্বী ভবন দেখতে হয় না। দেখতে হয়, সেই দেশ তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পেরেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে যখনই কোনো শিশু নির্যাতনের খবর আসে, আমরা আর খুব বেশি বিস্মিত হই না। কয়েক ঘণ্টা ক্ষোভ প্রকাশ করি, কয়েক দিন আলোচনা করি, তারপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে ঢেকে দেয়। কিন্তু যে শিশুটি নির্যাতনের শিকার হয়, তার জীবনে সেই ক্ষত কখনোই মুছে যায় না।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে সময়ে সময়ে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, অমানবিক শাস্তি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিটি ঘটনাই আমাদের সামনে একই প্রশ্ন এনে দাঁড় করায়—আমরা কি শিশুদের নিরাপত্তাকে সত্যিই গুরুত্ব দিচ্ছি, নাকি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে?
আমরা একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। একটি শিশুকে এমনভাবে পেটানো হয় যে তাকে হাসপাতালে নিতে হয়। একটি শিশু বছরের পর বছর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, অথচ কেউ জানে না। অভিযোগ উঠলে প্রথম প্রশ্ন হয় না, ‘শিশুটি কেমন আছে?’
প্রথম প্রশ্ন হলো, ‘প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষা করা যাবে তো?’— এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কোনো আইনই যথেষ্ট হবে না। ধর্মের নামে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠান কখনোই আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। ধর্ম মানুষকে ন্যায়, দয়া ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। তাই যে ব্যক্তি ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে একটি শিশুর ওপর নির্যাতন চালায়, সে শুধু আইনের নয়, ধর্মীয় নৈতিকতারও বিশ্বাসঘাতক।
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো নীরবতা। যখন একজন শিক্ষক বা তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঘটনাকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা হয়। কখনো বলা হয়, ‘শিক্ষার জন্য একটু শাসন দরকার।’ কখনো বলা হয়, ‘প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে।’ আবার কখনো ভুক্তভোগী পরিবারকে আপসের চাপ দেওয়া হয়।
এই সংস্কৃতি অপরাধীদের রক্ষা করে। একজন অপরাধীকে বাঁচাতে গিয়ে আমরা হাজারো শিশুকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিই। এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি। সব মাদ্রাসাকে এক কাতারে দাঁড় করানো যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতিটি ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে উড়িয়ে দেওয়াও সমান অন্যায়।
যদি একই ধরনের অপরাধ বছরের পর বছর বিভিন্ন স্থানে পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে সেটি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; সেটি একটি কাঠামোগত সতর্কসংকেত। সেই সংকেতকে গুরুত্ব না দিলে দায় এড়ানো যায়, কিন্তু দায়িত্ব এড়ানো যায় না।
আজ আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে। কেন প্রতিটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতি নেই? কেন প্রতিটি শিক্ষক ও কর্মচারীর কঠোর যাচাই-বাছাই হয় না? কেন শিশুরা নিরাপদভাবে অভিযোগ করার সুযোগ পায় না? কেন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ভুক্তভোগীকেই সন্দেহ করা হয়? কেন একটি শিশুর কান্নার চেয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম বড় হয়ে ওঠে? এসব প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দিতে হবে।
সমাজকেও দিতে হবে। এখন সময় এসেছে কয়েকটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
প্রথমত, দেশের সব আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতি আইনগতভাবে কার্যকর করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শারীরিক শাস্তির নামে সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, যৌন নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্রভাব যেন তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে।
চতুর্থত, শিশুদের তাদের অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। একজন শিশুও যেন না ভাবে, নির্যাতন সহ্য করাই তার নিয়তি।
পঞ্চমত, অভিভাবকদেরও অন্ধ বিশ্বাসের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে পারে, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা কখনোই সন্তানের নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না।
আজ যে শিশুটি কথা বলতে পারছে না, সে আমাদের ব্যর্থতার নীরব সাক্ষী। আজ যে শিশুটি ভয়ে কাঁপছে, তার ভয় আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। আর আজ যে অপরাধী মনে করছে, সে পার পেয়ে যাবে—তার সাহসের পেছনেও আমাদের দীর্ঘদিনের নীরবতা কাজ করছে।
রোদসীর পক্ষ থেকে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নই। আমরা কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নই। আমরা নির্যাতনের বিরুদ্ধে। আমরা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে।
আমরা সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, যেখানে একজন শিশুর কান্নাকে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার নিচে রাখা হয়।
একটি শিশুর নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যায়, তবে আমরা যত বড় বড় নৈতিকতার কথাই বলি না কেন, তা কেবল শব্দ হয়েই থাকবে। কারণ একটি সভ্য সমাজের প্রথম পরিচয় তার ধর্মীয় পরিচয় নয়, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অর্থনৈতিক পরিচয়ও নয়। তার প্রথম পরিচয়—সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে।
যেদিন একটি শিশু নির্ভয়ে বলতে পারবে, ‘আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে’, এবং সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে, সেদিনই আমরা বলতে পারব, আমরা সত্যিই একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ার পথে এগোচ্ছি।
তার আগে প্রতিটি নির্যাতিত শিশুর কান্না আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।