হরমোনের পরিবর্তনে নারীর শরীর ও মনের যত্ন


ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

নারীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শরীরে স্বাভাবিকভাবেই হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। কৈশোর থেকে শুরু করে মাসিক চক্র, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময় এবং মেনোপজ প্রতিটি ধাপেই হরমোনের ওঠানামা শরীরের পাশাপাশি মনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বয়সের পরিবর্তনের সঙ্গে শরীর ও মনের এই পরিবর্তনগুলো বোঝা এবং সঠিক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কোন কোন বয়সে হরমোনের পরিবর্তন হয়?


কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালে সাধারণত ৮ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে হরমোনজনিত শারীরিক পরিবর্তন শুরু হতে পারে। এ সময় শরীরের বৃদ্ধি, স্তনের বিকাশ, শরীরে লোম গজানো, ব্রণ এবং মাসিক শুরু হওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা যায়।


প্রজননক্ষম বয়সে প্রতি মাসেই হরমোনের ওঠানামা হয়। মাসিকের আগে অনেক নারীর শরীর ও মেজাজে পরিবর্তন দেখা যায়, যা
PMS নামে পরিচিত। এ সময় পেট ফাঁপা, স্তনে অস্বস্তি, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ, মন খারাপ বা দুশ্চিন্তা হতে পারে।


গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের পরের সময়েও হরমোনের বড় পরিবর্তন ঘটে।শরীরের সঙ্গে সঙ্গে আবেগ ও মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন হতে পারে। এই সময় পরিবারের সহযোগিতা এবং মায়ের শারীরিক ও মানসিক যত্ন বিশেষ প্রয়োজন।


৩০-এর শেষ থেকে ৪০-এর দশকে অনেক নারীর শরীরে মেনোপজের আগের সময়, অর্থাৎ পেরিমেনোপজের পরিবর্তন শুরু হতে পারে। এরপর সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে মেনোপজ হতে পারে, যদিও ব্যক্তিভেদে সময়ের পার্থক্য থাকে।


কী কী লক্ষণ দেখা যেতে পারে?


হরমোনের পরিবর্তন সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। তবে বয়স ও জীবনের পর্যায়ভেদে দেখা যেতে পারে,মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা রক্তপাতের পরিমাণ পরিবর্তন।

  • হঠাৎ গরম লাগা বা অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • ঘুমের সমস্যা
  • মেজাজের পরিবর্তন, অস্থিরতা বা মন খারাপ
  • দুশ্চিন্তা ও খিটখিটে ভাব।
  • ক্লান্তি ও শক্তি কমে যাওয়া
  • মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে সাময়িক সমস্যা।
  • ত্বক ও চুলে পরিবর্তন।
  • ওজন বৃদ্ধি, বিশেষ করে পেটের চারপাশে।
  • যোনিপথে শুষ্কতা ও অস্বস্তি।
  • মাথাব্যথা, শরীর বা জয়েন্টে ব্যথা।
  • পেরিমেনোপজ ও মেনোপজে মাসিকের পরিবর্তন, হট ফ্ল্যাশ, রাতের ঘাম, ঘুমের সমস্যা এবং মুড সুইং বেশ পরিচিত লক্ষণ।

 

বিশেষজ্ঞরা কী বলেন?


বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমোনের পরিবর্তন নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হলেও সব ধরনের শারীরিক বা মানসিক পরিবর্তনকে শুধু ‘হরমোনের সমস্যা’ ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়।


অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত রক্তপাত, দীর্ঘদিন মাসিকের অনিয়ম, তীব্র মুড সুইং কিংবা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারণ থাইরয়েডের সমস্যা, জরায়ুর বিভিন্ন সমস্যা বা অন্য শারীরিক কারণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।


বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, নিজের শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত থাকা এবং প্রয়োজন হলে মাসিক ও উপসর্গের একটি রেকর্ড রাখা উপকারী হতে পারে।
এতে পরিবর্তনের ধরন বুঝতে এবং চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে সুবিধা হয়।


কীভাবে নিজের যত্ন নেবেন?


সুষম খাবার খান :
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার রাখুন।


নিয়মিত শরীরচর্চা করুন :
হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

 

ঘুমকে গুরুত্ব দিন : পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

 

নিজের মনের কথা শুনুন : মন খারাপ, উদ্বেগ বা অস্থিরতা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে তা চেপে না রেখে কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

 

Me Time/নিজের জন্য সময় রাখুন : সংসার, কাজ ও পরিবারের দায়িত্বের মাঝেও নিজের বিশ্রাম এবং পছন্দের কাজের জন্য কিছুটা সময় রাখা জরুরি।

 

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন : বয়স ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।


সবশেষে মনে রাখতে হবে, হরমোনের পরিবর্তন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তবে এই পরিবর্তনের সময় নিজেকে অবহেলা না করে শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া, সঠিক জীবনযাপন করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো পথ।


নিজের শরীরের পরিবর্তনকে ভয় নয় বোঝার চেষ্টা করুন, যত্ন নিন এবং সুস্থ থাকুন।



ঢাকা/টিএ

sidebar ad