একটি ব্যবসা ভালো চলছে। নিয়মিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে, কর্মীদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে, সরবরাহকারীর বিলও সময়মতো পরিশোধ হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ বিক্রি কমে গেল। কোনো বড় ক্রেতার পাওনা আটকে আছে, পণ্যের দাম বেড়েছে কিংবা অপ্রত্যাশিত একটি খরচ এসে পড়েছে। তখনই বোঝা গেল, ব্যবসা চালানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ হাতে নেই।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত সঞ্চয় ভাঙেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেন কিংবা ব্যাংকঋণের জন্য ছোটাছুটি শুরু করেন। অথচ আগে থেকে কিছু অর্থ আলাদা করে রাখা থাকলে সংকটের সময় তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ অনেক বেশি থাকত।
এই আলাদা করে রাখা অর্থই ব্যবসার জরুরি তহবিল। এটি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং ব্যবসার আর্থিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ব্যবসা ভালো চললেও জরুরি তহবিল প্রয়োজন কেন?
ব্যবসার আয় সব সময় সমান থাকে না। কোনো মাসে বিক্রি বেশি হয়, কোনো মাসে কম। উৎসবের আগে পোশাকের দোকানে বিক্রি বাড়তে পারে, আবার উৎসবের পর তা কমে যেতে পারে। কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বড় অর্ডার আসতে পারে, কিন্তু পরবর্তী অর্ডার পেতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এ ছাড়া ব্যবসার বাইরের কিছু পরিবর্তনও উদ্যোক্তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, সরবরাহে বিঘ্ন, গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতার অর্থ পরিশোধে দেরি কিংবা হঠাৎ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব বদলে দিতে পারে।
এমন সময় জরুরি তহবিল থাকলে ব্যবসার প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে প্রতিবার নতুন ঋণ নিতে হয় না। আবার সাময়িক সংকটে পড়েই লোকসানে পণ্য বিক্রি করা, কর্মী ছাঁটাই করা কিংবা ব্যবসা বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপও কমে।
তবে জরুরি তহবিল সব ধরনের ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান নয়। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান হলে বা ব্যবসার আয় দিয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটানো সম্ভব না হলে মূল সমস্যাটিও সমাধান করতে হবে।
কত মাসের খরচের টাকা জমিয়ে রাখবেন?
এ প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তর নেই। ব্যবসার ধরন, আয় কতটা নিয়মিত, গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার সময়, ঋণের কিস্তি এবং নতুন অর্থ সংগ্রহের সুযোগের ওপর প্রয়োজনীয় তহবিলের পরিমাণ নির্ভর করে।
সাধারণভাবে একটি ছোট ব্যবসার অন্তত তিন মাসের অপরিহার্য পরিচালন ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে জরুরি তহবিল গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। আয় অনিয়মিত হলে, ব্যবসায় মৌসুমি ওঠানামা থাকলে কিংবা বড় অঙ্কের ঋণের দায় থাকলে ছয় মাস বা তারও বেশি সময়ের ব্যয় ধরে পরিকল্পনা করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোট বিক্রির পরিমাণ নয়, ব্যবসা সচল রাখতে ন্যূনতম কত টাকা প্রয়োজন, সেই হিসাব করা।
ধরা যাক, একটি ছোট প্রতিষ্ঠানের মাসিক অপরিহার্য ব্যয় হলো—
* কর্মীদের বেতন: ৬০ হাজার টাকা
* দোকান বা অফিসভাড়া: ২০ হাজার টাকা
* বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়: ১০ হাজার টাকা
* ঋণের নির্ধারিত কিস্তি: ১০ হাজার টাকা
মোট অপরিহার্য মাসিক ব্যয় দাঁড়াল এক লাখ টাকা।
এই হিসাবে তিন মাসের জরুরি তহবিল হবে তিন লাখ টাকা। ছয় মাসের নিরাপত্তা রাখতে চাইলে প্রয়োজন হবে ছয় লাখ টাকা।
এটি একটি উদাহরণমাত্র। বাস্তবে পণ্য কেনার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর মূলধন, মৌসুমি ব্যয়, বকেয়া দায় এবং সংকটের সময় কোন খরচগুলো কমানো সম্ভব—এসব বিবেচনা করে তহবিলের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।
জরুরি তহবিল আর ব্যবসার চলতি মূলধন কি এক?
দুটি বিষয় কাছাকাছি হলেও এক নয়।
চলতি মূলধন হলো ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে প্রয়োজনীয় অর্থ। যেমন পণ্য কেনা, কাঁচামাল সংগ্রহ, কর্মীদের বেতন দেওয়া এবং বিক্রির পরবর্তী চক্র পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো।
অন্যদিকে জরুরি তহবিল রাখা হয় অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে ব্যবসার অপরিহার্য ব্যয় সামলানোর জন্য।
ধরা যাক, একটি পোশাকের দোকান আগামী মাসের বিক্রির জন্য নতুন পণ্য কিনতে দুই লাখ টাকা রাখল। এই অর্থ চলতি ব্যবসার অংশ। হঠাৎ বিক্রি কমে গেলে কর্মীদের বেতন ও ভাড়া দেওয়ার জন্য যে অর্থ আলাদা করে রাখা হয়েছে, সেটিই জরুরি তহবিলের অংশ।
দুই ধরনের অর্থ একসঙ্গে ব্যবহার করলে প্রকৃত জরুরি সময়ে নিরাপত্তা কমে যেতে পারে। তাই হিসাবের খাতায় দুটির জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা ভালো।
অল্প আয় থেকেও কীভাবে তহবিল গড়বেন?
অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে একবারে কয়েক লাখ টাকা আলাদা করে রাখা সম্ভব নয়। তাই জরুরি তহবিল গড়তে বড় অঙ্কের অর্থের অপেক্ষা না করে নিয়মিত ছোট অঙ্ক দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
প্রথমে মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাব করে দেখুন, সব প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর বাস্তবে কত টাকা অবশিষ্ট থাকে। সেই অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ জরুরি তহবিলে জমা রাখুন। ব্যবসার আয় বেশি হলে সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে, আবার আয় কম হলে সামর্থ্য অনুযায়ী কমানো যায়।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো উদ্যোক্তা প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা জমাতে পারলে এক বছরে তাঁর সঞ্চয় হবে ৬০ হাজার টাকা। মাসে দশ হাজার টাকা জমাতে পারলে এক বছরে হবে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। এটি কেবল নিয়মিত সঞ্চয়ের হিসাব; সুদ বা মুনাফা যুক্ত হলে ফল ভিন্ন হতে পারে।
প্রথম লক্ষ্য হতে পারে এক মাসের অপরিহার্য ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ জমা করা। এরপর ধীরে ধীরে তিন মাস এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ছয় মাসের লক্ষ্যে এগোনো যায়।
তবে জরুরি তহবিল গড়ার জন্য ব্যবসার প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা বন্ধ করা কিংবা কর্মীদের বেতন আটকে রাখা উচিত নয়। সঞ্চয়ের পরিকল্পনা হতে হবে ব্যবসার বাস্তব সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তহবিল কোথায় রাখবেন?
জরুরি তহবিলের মূল উদ্দেশ্য বেশি মুনাফা অর্জন নয়; প্রয়োজনের সময় দ্রুত অর্থ ব্যবহার করতে পারা। তাই এমন জায়গায় অর্থ রাখা উচিত, যেখানে নিরাপত্তা ও অর্থ তোলার সুবিধা দুটিই বিবেচনায় থাকে। ব্যাংকের সহজে ব্যবহারযোগ্য হিসাবে একটি অংশ রাখা যেতে পারে। তবে সব অর্থ এমন কোনো বিনিয়োগে আটকে রাখা ঠিক নয়, যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় দ্রুত টাকা তোলা যায় না কিংবা আগাম তুললে বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
আবার ব্যবসার জরুরি তহবিলকে ব্যক্তিগত কেনাকাটা, নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ কেনার কাজে ব্যবহার করলে এর উদ্দেশ্য নষ্ট হবে।
এই অর্থ ব্যবহারের জন্য কিছু নিয়ম আগে থেকেই নির্ধারণ করা ভালো। যেমন, বিক্রি হঠাৎ কমে গেলে, জরুরি যন্ত্রপাতি মেরামত করতে হলে কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস না থাকলে তহবিল ব্যবহার করা যাবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ব্যবহৃত অর্থ আবার পূরণ করতে হবে।
জরুরি তহবিল থাকলেই কি ব্যবসা নিরাপদ?
জরুরি তহবিল ব্যবসাকে সময় দেয়, কিন্তু নিজে থেকে ব্যবসাকে লাভজনক করে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় যদি দীর্ঘদিন ধরে তার ব্যয়ের চেয়ে কম থাকে, তাহলে শুধু সঞ্চয় ব্যবহার করে সেই ঘাটতি পূরণ করতে থাকা টেকসই সমাধান নয়।
তাই জরুরি তহবিলের পাশাপাশি নিয়মিত বিক্রি, প্রকৃত লাভ, পাওনা আদায়, পণ্যের মজুত এবং ঋণের দায় পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যবসায় আয় কমে গেলে দ্রুত কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য, ব্যয় কিংবা বিক্রির কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক অর্থ আলাদা রাখা জরুরি। বিশেষ করে পারিবারিক ব্যবসায় অনেক সময় দুটির হিসাব এক হয়ে যায়। এতে ব্যবসার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বোঝা কঠিন হয়।
ব্যবসা কখনোই ঝুঁকিমুক্ত নয়। কিন্তু প্রতিটি ঝুঁকির মুখে পড়ে নতুন করে অর্থের ব্যবস্থা করার চেয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি রাখা অনেক বেশি কার্যকর।
আজ ব্যবসা ভালো চলছে বলেই আগামী মাসেও একই পরিমাণ আয় হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই লাভের একটি অংশ নিয়মিত আলাদা করে রাখা শুধু সঞ্চয়ের অভ্যাস নয়; এটি ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষার পরিকল্পনাও।
কারণ, ব্যবসায় সাফল্য শুধু কত টাকা আয় হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কঠিন সময়েও কতটা প্রস্তুত থাকা গেল, সেটিও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
আরও পড়ুন: ব্যবসায় আয় হচ্ছে, তবু সঞ্চয় বাড়ছে না কেন? সংসার ও ব্যবসার টাকার হিসাব আলাদা রাখুন (পর্ব ৫)