দেবী বন্দিত, নারী যেন অবহেলিত না থাকে

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬

দেবী বন্দিত, নারী যেন অবহেলিত না থাকে

শরতের আকাশে সাদা মেঘ, কাশফুলের দোলা আর ঢাকের শব্দে ফিরে আসে শারদীয় দুর্গোৎসব। মণ্ডপে মণ্ডপে অধিষ্ঠিত হন দশভুজা দেবী দুর্গা—মহিষাসুরমর্দিনী, অশুভের বিনাশকারী, শক্তি ও সাহসের প্রতীক। তাঁর হাতে অস্ত্র, চোখে প্রত্যয়, অবয়বে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অদম্য প্রতিরোধের ভাষা। তিনি শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক।


কিন্তু উৎসবের আলোয় দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই—যে সমাজ দেবীকে শক্তির সর্বোচ্চ প্রতীকে প্রতিষ্ঠা করে, সেই সমাজ বাস্তবের নারীকে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিতে এত দ্বিধা করে কেন?


দেবীর বন্দনায় কণ্ঠ উঁচু হয়, কিন্তু নারীর অধিকারের প্রশ্নে সেই কণ্ঠ কতটা দৃঢ়? মণ্ডপে নারীশক্তির জয়গান ওঠে, অথচ ঘরে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা সামাজিক পরিসরে নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত হলে আমরা কতটা প্রতিবাদ করি? দেবীর হাতে অস্ত্র দেখে আমরা শক্তির মাহাত্ম্য উপলব্ধি করি; কিন্তু বাস্তবের নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললে তাঁকেই কেন প্রায়ই সহনশীলতা, শিষ্টাচার কিংবা পারিবারিক সম্মানের পাঠ দেওয়া হয়?- এ প্রশ্ন ধর্মবিশ্বাসের বিরোধিতা নয়। বরং যে মূল্যবোধকে আমরা শ্রদ্ধা করি, বাস্তব জীবনে তার কতটা চর্চা করি, সেই হিসাব নেওয়ার তাগিদ।


দেবীর শক্তি ও প্রাচীন সমাজের বাস্তবতা


দেবী দুর্গার পরিচয় ভারতীয় উপমহাদেশের দীর্ঘ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। দেবীমাহাত্ম্য গ্রন্থে তিনি মহিষাসুরকে পরাজিতকারী মহাশক্তি। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ হিসেবে আবির্ভূত হলেও বিজয়ের কেন্দ্রে থাকেন তিনিই। তিনি সংকটের সমাধান করেন, যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং নিজের শক্তিতে অশুভের মোকাবিলা করেন।


এই পৌরাণিক আখ্যানের তাৎপর্য গভীর। নারী এখানে কেবল কারও সহায়তাকারী নন; তিনি নিজেই নেতৃত্ব দিতে পারেন, সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে পারেন। তাঁর শক্তি নিজস্ব সত্তার প্রকাশ।


কিন্তু দেবীর সর্বশক্তিমান রূপের উপস্থিতি প্রাচীন সমাজে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা ছিল না। ইতিহাসবিদ বিহানি সরকার তাঁর হিরোইক শাক্তিজম: দ্য কাল্ট অব দুর্গা ইন অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়ান কিংশিপ গ্রন্থে প্রাচীন ভারতীয় রাজশক্তির সঙ্গে দুর্গার উপাসনার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে দেবীর উপাসনা ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি রাজনীতি, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।


এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। দেবীকে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠা করা এবং বাস্তবের নারীকে সমান সামাজিক ক্ষমতা দেওয়া এক বিষয় নয়। কোনো সমাজে নারীকে দেবীরূপে কল্পনা করা হতে পারে, অথচ সেই সমাজের নারীরা সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষার সুযোগ, চলাফেরার স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় বৈষম্যের শিকার হতে পারেন।


প্রতীকের মহিমা তাই বাস্তবের সমতার প্রমাণ নয়। সমাজে নারীর অবস্থান নির্ধারিত হয় অধিকার, সুযোগ, সম্পদের বণ্টন এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর মধ্য দিয়ে।


নারীকে শক্তিশালী বলা হয়, কারণ তাঁর ওপর দায়িত্বের বোঝা বেশি?


আমাদের সমাজে নারীকে প্রায়ই বলা হয়—তিনি ধৈর্যশীল, সহনশীল, ত্যাগী, সংসারের প্রাণ। কিন্তু এই প্রশংসার আড়ালে কখনো কখনো এমন প্রত্যাশা লুকিয়ে থাকে, যেখানে নারীকে সবকিছু সহ্য করতে হয়, সব দায়িত্ব সামলাতে হয়, এবং নিজের চাওয়া-পাওয়াকে পিছনে রাখতে হয়।


একজন নারী সংসার ও কর্মক্ষেত্র সামলালে তাঁর প্রশংসা করা হয়; কিন্তু সংসারের অধিকাংশ দায়িত্ব কেন তাঁর ওপরই থাকবে, সেই প্রশ্ন অনুচ্চারিত থেকে যায়। একজন মা সন্তানের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিলে তাঁর ত্যাগকে মহিমান্বিত করা হয়; অথচ সন্তানের দায়িত্ব মা-বাবা সমানভাবে ভাগ করে নেবেন কি না, সে প্রশ্নে সমাজের আগ্রহ কম।


এখানেই শক্তির ধারণাটি বিকৃত হয়ে যায়। নারীর সহ্যক্ষমতাকে তাঁর শক্তি বলা হয়, কিন্তু সেই সহ্যক্ষমতার সুযোগ নিয়ে তাঁর ওপর আরও দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর ত্যাগকে মহৎ বলা হয়, কিন্তু সেই ত্যাগের প্রয়োজন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় না।


নারী সবকিছু সামলাতে পারেন—এটি তাঁর সক্ষমতার স্বীকৃতি হতে পারে; কিন্তু তাই বলে সবকিছু তাঁকেই সামলাতে হবে, এটি কোনো ন্যায়সংগত সামাজিক প্রত্যাশা নয়।


নারীর শক্তির প্রকৃত স্বীকৃতি তাঁকে আরও বেশি বোঝা বহন করতে বাধ্য করা নয়। বরং এমন সমাজ তৈরি করা, যেখানে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে প্রতিদিন লড়তে হবে না; যেখানে তাঁর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, তাঁর শ্রমের মূল্য থাকবে এবং তাঁর নিরাপত্তা অন্যের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।


অর্থনীতিতে নারীর অবদান, স্বীকৃতি কোথায়?


আজকের নারী উদ্যোক্তা, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসক ও নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিবার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতেও তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও নারীর শ্রমের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়—ঘরের ভেতরের অবৈতনিক কাজ।


রান্না, ঘর পরিষ্কার, শিশু লালন-পালন, অসুস্থ মানুষের পরিচর্যা এবং পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর কাজ পরিবারকে সচল রাখে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সময়-ব্যবহার জরিপেও নারীর গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। অথচ এই শ্রমের অধিকাংশের জন্য কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ স্বীকৃতিও মেলে না।


একজন মানুষ বাইরে গিয়ে আয় করতে পারেন, কারণ ঘরে কেউ তাঁর খাবার তৈরি করেন, সন্তানের যত্ন নেন, পরিবারের প্রয়োজন সামলান। অথচ অর্থনীতির প্রচলিত আলোচনায় এই শ্রম প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। যে কাজের ওপর পরিবার ও কর্মজীবনের বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে, তার মূল্যকে অদৃশ্য রেখে উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ হিসাব দাবি করা যায় না।


নারী বাইরে কাজ করবেন, আয় করবেন, নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন—আবার ঘরে ফিরে একাই সব দায়িত্ব পালন করবেন; এই প্রত্যাশা সমতার নয়, বরং পুরোনো বৈষম্যের নতুন রূপ। নারীর ক্ষমতায়ন মানে তাঁকে আরও বেশি দায়িত্ব দেওয়া নয়; বরং দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন, বিশ্রামের অধিকার, আর্থিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করা।


পূজামণ্ডপের বাইরে নারীশক্তির পরীক্ষা


দুর্গাপূজা বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, শিল্প, সংগীত, ব্যবসা ও সামাজিক মিলনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। এই আয়োজনেও নারীর শ্রম ও সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।


তবু উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি বাস্তবের নারীর নিরাপত্তা, সম্মতি ও স্বাধীনতার প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক। একজন নারী কতটা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন? পরিবারের মেয়েটি নিজের পছন্দে জীবন গড়তে চাইলে তাকে সমর্থন করা হয়, নাকি সামাজিক সম্মানের নামে নিয়ন্ত্রণ করা হয়? কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর প্রতি সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়, নাকি তাঁর পোশাক ও আচরণকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়?


নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে তাঁকে ঘরে আটকে রাখা নয়; বরং জনপরিসরকে নিরাপদ করা। নারীর মর্যাদা রক্ষা মানে তাঁর হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং তাঁকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেওয়া।


এই পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু নারীর নয়। পরিবারে ছেলেমেয়ের মতামতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া, ছেলেদের গৃহস্থালি কাজে অংশ নিতে শেখানো, কর্মজীবী দম্পতির মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা রাখা—এসব সমানাধিকারের মৌলিক শর্ত। পুরুষের ভূমিকা নারীর স্বাধীনতার অনুমোদনদাতা হওয়া নয়; বরং সমান অধিকারসম্পন্ন অংশীদার হওয়া।


বিসর্জন হোক বৈষম্যের


দেবী দুর্গার প্রতিমা একসময় বিসর্জিত হবে। ঢাকের শব্দ থামবে, মণ্ডপের আলো নিভে আসবে, উৎসবের ব্যস্ততা ফিরে যাবে দৈনন্দিন জীবনের আড়ালে। কিন্তু সেই সঙ্গে যদি নারীশক্তির বন্দনাও বিসর্জিত হয়, তবে উৎসবের অন্তর্নিহিত শিক্ষা আমরা গ্রহণ করতে পারলাম কোথায়?


দেবীর সাহসের বন্দনা করে নারীর প্রতিবাদকে অশোভন বলা যায় না। দেবীর বিজয় উদ্‌যাপন করে নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে তুচ্ছ করা যায় না।বাস্তবের নারীকে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রাখাকে ঐতিহ্যের অজুহাতে বৈধতা দেওয়া যায় না।


রোদসী মনে করে, কর্মক্ষেত্রে নারী সমান সুযোগ পান, যে সমাজে নির্যাতনের শিকার নারী ন্যায়বিচার পান এবং যে রাষ্ট্র নারীর অধিকার রক্ষায় জবাবদিহি নিশ্চিত করে, সেখানেই নারীশক্তির বন্দনা বাস্তব তাৎপর্য পায়।


দেবী দুর্গার হাতে অস্ত্র আছে; বাস্তবের নারীকে প্রতিদিন অস্ত্র হাতে লড়তে হবে—এমন সমাজ আমরা চাই না। আমরা চাই, ন্যায় ও সমতার এমন পরিবেশ, যেখানে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীর প্রতিদিনের জীবন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠবে না।


দেবীকে পূজা করে সমাজ তার বিশ্বাস প্রকাশ করে; নারীকে সমান অধিকার দিয়ে সমাজ তার সভ্যতার পরিচয় দেয়। প্রতিমার সামনে প্রণাম যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর মর্যাদার স্বীকৃতি।


শুভ শারদীয় দুর্গোৎসব।

sidebar ad