ফ্যাশন দুনিয়ায় কখন কী ট্রেন্ড হয়ে যায়, তা আগে থেকে বোঝা বড্ড মুশকিল! কখনো ছেঁড়া জিনস, কখনো পায়ের জুতার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাগ, আবার কখনো এমন সব পোশাক আর অ্যাকসেসরিজ হাজির হয়, যা দেখে প্রথমে মনে হতে পারে, ‘এ আবার কীভাবে পরতে হয় রে বাবা?’ অথচ কিছুদিন পর সেই অদ্ভুত জিনিসই হয়ে ওঠে ফ্যাশনপ্রেমীদের পছন্দের তালিকায়।
ফ্যাশন যে নিয়ম ভাঙতে ভালোবাসে, তার প্রমাণ
তো কম নেই! 'ক্লিন গার্ল বিউটি' ইমেজ ভেঙে
তাতে এসেছে 'মেসি গার্ল' বা 'অ্যান্টি-পারফেকশন ধারা', স্লিক বান থেকে মেসি হেয়ার,
বিয়ের সাজে কনের পায়ে স্নিকার্স, মুখভর্তি স্টিকার বা গ্লিটারে উৎসবের সাজ- চলে হাজারো
এক্সপেরিমেন্ট।
বাহুতে বাজুবন্ধনী, হাতে চুড়ি, কবজিতে ব্রেসলেট
কিংবা পায়ে নূপুর; শরীরের প্রতিটি অঙ্গই যদি পেতে পারে অলংকারের ছোঁয়া, তখন মুখই বা
বাদ থাকবে কেন? এবার গয়নার নজর মুখের দিকেও। মুখের চারপাশে, গালের হাড়ে কিংবা কপালের
পাশে ঝলমলে অলংকারের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের স্টাইল স্টেটমেন্ট।
ফেসলেট—মুখের সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ
করা ২০২৬-এর সবচেয়ে আলোচিত গয়না ট্রেন্ড। চলুন, জেনে নেওয়া যাক ফ্যাশনের এই নতুন আকর্ষণ
সম্পর্কে।
ফেসলেট মূলত মুখের একটি অনুষঙ্গ। আপনি যদি
ফ্যাশনের জগতে কোনো ভাইরাল ট্রেন্ড খুঁজে থাকেন, তবে এটি অবশ্যই আপনার জন্য। 'ফেস’এবং ‘ব্রেসলেট’ শব্দের মিশ্রণে
তৈরি এই অলংকার মূলত মুখের বিভিন্ন কনট্যুর—যেমন গালের হাড় (cheekbones), কপালের পাশ,
চোখের বাইরের কোণ বা চোয়াল ঘিরে পরা হয়। ডিজাইনারদের
মতে, ফেসলেট আধুনিক পরিধানযোগ্য ফ্যাশনের এমন এক অনন্য নিদর্শন, যা মুখের গড়নকে সুন্দরভাবে
ফুটিয়ে তোলে। মিনিমাল সাজে একটু সাহসী ছোঁয়া দিতে কিংবা উৎসবের সাজে নিজেকে অন্যদের
থেকে কিছুটা আলাদা করে তুলতে এ ধরনের ফেস অ্যাকসেসরিজ হতে পারে নতুন আকর্ষণ।
দেখতে জমকালো কিন্তু ওজনে অত্যন্ত হালকা এই গহনাগুলো সাধারণত সোনা বা রুপার প্রলেপ এবং অন্যান্য ধাতব ফিনিশে তৈরি করা হয় এবং প্রায়শই পার্ল বা মুক্তা, এডি স্টোন এবং কুন্দনের নকশা দিয়ে সজ্জিত থাকে।
এর বিভিন্ন ধরনের মধ্যে রয়েছে চিকবোন ড্রপ
(একক পাথর বা গুচ্ছ), টেম্পল অ্যাকসেন্ট, কান থেকে চিকবোনের দিকে নেমে আসা চিকন চেইন
এবং এডিটোরিয়াল বা ক্যুচার লুকের জন্য আরও শৈল্পিক ধরনের মুখের অলঙ্কার। ধরনের মধ্যে রয়েছে চিকবোন ড্রপ (একক পাথর বা
গুচ্ছ), টেম্পল অ্যাকসেন্ট, কান থেকে চিকবোনের দিকে নেমে আসা চিকন চেইন এবং এডিটোরিয়াল
বা ক্যুচার লুকের জন্য আরও শৈল্পিক ধরনের মুখের অলঙ্কার।
আরোও পড়ুন: চোখেরসাজে এবার ‘বোল্ড’—মিলানের রানওয়ে থেকে ফিরছে রঙ, গ্লিটার ও ক্রিস্টাল
২০২৬ সালের ফ্যাশন আলোচনায় ফেসলেটের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল প্রকাশনা 'কসমোপলিটান ইন্ডিয়া', 'দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া' সহ বিভিন্ন জার্নালেও উঠে এসেছে এই ব্যতিক্রমী গয়নার কথা। বর্তমানে ফ্যাশনপ্রেমী তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে হবু কনের সাজেও এই নতুন ট্রেন্ড দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে।
মুখের সাজে আধুনিকতা, শিকড় প্রাচীন ঐতিহ্যে
ব্যবসায়িক বা একটি নির্দিষ্ট ট্রেন্ড ক্যাটাগরি
হিসেবে বিবেচনা করলে ফেসলেট শব্দটির পেটেন্ট বা ট্রেডমার্ক করে প্রথম গহনা বাজারে নিয়ে
আসে ভারতের লাক্সারি জুয়েলারি ব্র্যান্ড 'ভাইদান' (Vaidaan)। ২০২৫-২০২৬ সালের দিকে
তারা কনেদের জন্য চোখ ও গাল জুড়ে পরিধানযোগ্য মেটাল, মুক্তা ও ক্রিস্টালের তৈরি এই
‘ফেসলেট’ বাজারে নিয়ে আসেন,
যা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম রিলস-এ) ভাইরাল হয়ে যায়।
'ফেসলেট’ নামটি নতুন হলেও, মুখের অবয়বকে গহনা দিয়ে সাজানোর এই ধারণার পেছনে একটি প্রাচীন ইতিহাস এবং আধুনিক ফ্যাশন রানওয়ের বিবর্তন জড়িয়ে রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই কপালে ঝুলে থাকা 'মাথা পট্টি', গাল বেয়ে কান পর্যন্ত যাওয়া 'নথ বা নাকের চেইন' এবং কানের পাশ দিয়ে ঝুলে থাকা 'কানপাশা'র ঐতিহ্য রয়েছে। আধুনিক ফেসলেট মূলত এই প্রাচীন রাজকীয় গহনাগুলোরই একটি ফিউশন বা মডার্ন রূপান্তর।
বিয়ের বাজারে আসার আগে এই ধরণের ফেসিয়াল
জুয়েলারি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন রানওয়ে এবং পপ তারকাদের মিউজিক ভিডিওতে ব্যবহৃত হতে দেখা
যেত। বিখ্যাত পপ তারকা বিয়ন্সে এবং বিভিন্ন কে-পপ তারকাদের মিউজিক ভিডিও ও ম্যাগাজিন
শ্যুটে চোখের নিচে বা গালের ওপর মেটালের চেইন ও ক্রিস্টাল পরতে দেখা গেছে। সেই হাই-ফ্যাশন
ধারণাকেই বর্তমানে সাধারণ কনে এবং পার্টিপ্রেমীদের জন্য পরিধানযোগ্য হালকা গহনা হিসেবে
নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে।
এক কথায় বলতে গেলে, ফেসলেটের আইডিয়াটি প্রাচীন
ও বৈশ্বিক ফেস-জুয়েলারি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ডিজাইন। কোথাও মুঘল
অলংকারের ছাপ, কোথাও জ্যামিতিক নকশা, আবার কোথাও মিনিমাল ক্রিস্টালের ব্যবহার। ফলে
একই অ্যাকসেসরিজে পাওয়া যাচ্ছে দেশীয় সাজের আবহ এবং আধুনিক ফ্যাশনের সাহসী প্রকাশ।
কেমন হয় ফেসলেটের ডিজাইন?
ফেসলেটের ডিজাইন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়, শৈল্পিক এবং আধুনিক। চশমার মতো ফ্রেমের ধাঁচে তৈরি হলেও এতে কোনো কাঁচ থাকে না। মুখের অবয়বকে আরও সুন্দরভাবে হাইলাইট করতে এবং মেকআপের মতো একটি নিখুঁত ফ্রেম দিতে এর ডিজাইনগুলো বিভিন্ন স্টাইলে ভাগ করা হয়েছে।
- যারা খুব বেশি জমকালো সাজ পছন্দ করেন না
এবং প্রথমবার ফেসলেট পরতে চান, তাদের জন্য মিনিমালিস্ট বা হালকা ডিজাইন সেরা। এগুলো
সাধারণত খুব সরু মেটালের একক ফ্রেম বা সিঙ্গেল চেইন দিয়ে তৈরি হয়। ইন্দো-ওয়েস্টার্ন
পোশাক, পার্টি বা ক্যাজুয়াল ফ্যাশন শ্যুটের জন্য অতিরিক্ত ভারী ভাব না এনে মুখে সূক্ষ্ম
ঝলক যোগ করতে এটি দারুণ মানানসই।
- বর্তমান ব্রাইডাল ফ্যাশনে সবচেয়ে বেশি
ভাইরালে রয়েছে জিকজ্যাক (Zigzag) ও ওয়েভ আকৃতির ফেসলেটগুলো। এই ফ্রেমগুলোর ওপর আমেরিকান
ডায়মন্ড বা ক্রিস্টালের কুঁচি বসানো থাকে, যা আলোর প্রতিফলনে চমৎকার ঝকঝকে লুক দেয়।
- কনেদের বিয়ের সাজে (বিশেষ করে গায়ে হলুদ,
মেহেদি বা সঙ্গীত অনুষ্ঠানে) ব্যবহারের জন্য ব্রাইডাল ও ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনের ফেসলেটগুলো
তৈরি। এগুলো কিছুটা ভারী এবং রাজকীয় ধাঁচের হয়ে থাকে। ফ্রেমের নিচের অংশে ছোট ছোট মুক্তার
দানা (Pearls), জেমস্টোন কিংবা কুন্দনের ছোট ছোট চেইন বা ঝুমকো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। মুক্তোর
কোমল আভা আর সোনালি রঙের মেলবন্ধন বিয়ে, রিসেপশন কিংবা উৎসবের সাজে মানানসই। শাড়ি,
লেহেঙ্গা বা গাউনের সঙ্গে এটি হতে পারে আকর্ষণীয় সংযোজন।
- আরেক ধরনের আছে মাল্টি-লেয়ার চেইন ডিজাইন।
সোনালি বা রুপালি রঙের বেশ কয়েকটি সূক্ষ্ম চেইন চশমার মতো ফ্রেমের কান থেকে চোখের নিচ
দিয়ে ঝুলে থাকে। লেয়ারড চেইনের সাথে ছোট ছোট
পুঁতি বা স্টার-মুনের মতো মেটাল চার্মস যুক্ত থাকে। এটি পরলে পুরো মুখেই একটি গহনার
ওড়না বা আবরণের মতো আবহ তৈরি হয়। অ্যারাবিয়ান বা ফিউশন ব্রাইডাল লুক তৈরি করতে এই
ডিজাইনগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
- আরেক ব্যতিক্রমী ধরন হচ্ছে স্কাল্পচারাল ফেসলেট। এটি প্রথাগত বা ঐতিহ্যবাহী গহনার ভাগে পড়ে না। এই ব্যতিক্রমী স্টাইলটি লু হাই-ফ্যাশন ডিজাইনারদের রানওয়ে শো, বড় কোনো ম্যাগাজিনের কভার ফটোশ্যুট, থিয়েটার এবং রেড কার্পেটের মতো জায়গায় 'বোল্ড এবং ড্রামাটিক' লুক গঠনে ব্যবহার করা হয়।
মুখের গঠন অনুযায়ী ফেসলেট বেছে নেওয়ার টিপস
নিজের মুখের আকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে
সঠিক স্টাইলটি নির্বাচন করতে পারলে এটি যে কারও জন্য মানানসই হতে পারে।
- ওভাল বা ডিম্বাকৃতি মুখের গঠনকে সবচেয়ে
আদর্শ ধরা হয়, কারণ এর কপাল ও থুতনি সমানুপাতিক এবং গালের হাড় সামান্য উঁচু থাকে। প্রায়
সব ধরনের ফেসলেট বা ফ্রেম ভালো মানায় বলে, আপনি নির্দ্বিধায় ওভারসাইজড, চওড়া, চারকোনা
বা জ্যামিতিক যেকোনো স্টাইল বেছে নিতে পারেন। তবে মুখের স্বাভাবিক গঠন অনুযায়ী হালকা
ডিজাইন বেছে নিলে সৌন্দর্য আরও ফুটে ওঠে।
- রাউন্ড শেপের মুখের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায়
সমান হয় এবং গাল কিছুটা ফোলা বা ভরাট দেখায়। লম্বা ও উল্লম্ব (vertical) চেইনের ফেসলেট
বেছে নিন। এটি মুখকে লম্বা দেখাতে সাহায্য করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে মুখে ডেফিনিশন নিয়ে
আসে।
- স্কয়ার শেপের মুখের চোয়াল (Jawline) বেশ
চওড়া এবং কপাল ও চোয়ালের প্রস্থ সমান থাকে। এর শার্পনেস কিছুটা নরম বা কোমল করতে রাউন্ডেড
এলিমেন্ট প্রয়োজন। গোলাকার, ওভাল বা কার্ভড ডিজাইনের ফেসলেট বা ফ্রেম বেছে নিতে পারেন।
ক্যাট-আই (Cat-eye) স্টাইলও এই ধরনের মুখে দারুণ মানায়।
- হার্ট শেপের মুখের কপাল তুলনামূলক চওড়া হয় এবং থুতনির দিকটি ক্রমশ সরু বা ছুঁচলো হয়ে যায়। চওড়া কপাল এবং সরু থুতনির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার জন্য বেছে নিতে পারেন নিচের দিকে চওড়া বা ড্রপ-ডাউন ডিজাইন। ফ্রেম বা ফেসলেটের নিচের অংশটি চওড়া হলে তা সরু থুতনিকে ভরাট দেখাতে সাহায্য করে। লাইট-কালার বা রিমলেস স্টাইলও ভালো অপশন হতে পারে।
যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন-
মুখের গয়না যেহেতু সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে
থাকে, তাই শুধু সৌন্দর্য নয়, আরাম ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফেসলেট পরার
আগে কিছু বিষয় মনে রাখবেন:
- প্রথমবার পরলে হালকা ও সহজে পরা যায় এমন
ডিজাইন বেছে নেয়াই শ্রেয়।
- ত্বকে অ্যালার্জি হওয়ার প্রবণতা থাকলে
ধাতুর উপাদান যাচাই করুন। নিকেলযুক্ত গয়না সংবেদনশীল ত্বকে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
- চোখের খুব কাছে ধারালো প্রান্তগুলো চেক
করে নিন। এছাড়াও তাতে থাকা পাথর বা অস্বস্তিকর কোন সংযোগযুক্ত থাকলে তা এড়িয়ে চলুন।
- আঠা দিয়ে আটকাতে হয় এমন ডিজাইন হলে ত্বকের
জন্য উপযুক্ত পণ্য ব্যবহার করুন; এক্ষেত্রে সাধারণ ক্রাফট আঠা ব্যবহার করবেন না।
- ফেসলেট ভারী হলে বা নড়াচড়ায় ত্বকে টান
পড়লে সেটি খুলে ফেলুন।
- ফেসলেট নিজেই একটা স্বতন্ত্র ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। এটা পরলে সঙ্গে ভারী কানের দুল, গলার হার ও জমকালো
মেকআপ করার কোন প্রয়োজন পড়ে না। তাই মুখের গয়নাটিকে প্রধান আকর্ষণ রেখে বাকি সাজ কিছুটা
সংযত রাখলে পুরো লুক আরও পরিপাটি দেখাতে পারে।
ফ্যাশনের ট্রেন্ড আসে, আবার সময়ের সঙ্গে বদলেও যায়। সব ট্রেন্ডের উদ্দেশ্য শুধু নতুন কিছু পরা নয়; নিজের পছন্দ ও ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করাও ফ্যাশনের একটি বড় অংশ। নিজের সাজে ভিন্নতা আনতে চাইলে ফেসলেট হতে পারে আপনার পারফেক্ট স্টেটমেন্ট পিস।
যদিও এটি এখনো সবার দৈনন্দিন সাজের অংশ হয়ে
ওঠেনি। তুলনামূলকভাবে সাহসী ও বিশেষ ধরনের অ্যাকসেসরিজ হিসেবে একে গণ্য করা হয়। তাই
ট্রেন্ড অনুসরণ করার জন্যই এটি পরতে হবে, এমন নয়। নিজের পোশাক, স্বাচ্ছন্দ্য এবং অনুষ্ঠানের
সঙ্গে মানানসই হলে তবেই বেছে নেওয়া ভালো।
ঢাকা/টিএ