কয়েকটি মৌসুম ধরে মেকআপের জগতে ছিল ‘কমই বেশি’-র রাজত্ব। চোখের পাতায় প্রায় নেই বললেই চলে এমন আইশ্যাডো, হালকা মাসকারা, ন্যাচারাল স্কিন আর খুব সংযত মেকআপ—সব মিলিয়ে ‘ক্লিন’ ও মিনিমাল লুকই ছিল আলোচনায়। কিন্তু মিলান ফ্যাশন উইক স্পষ্ট করে দিল, চোখের সাজ এবার আর এতটা চুপচাপ থাকতে চাইছে না।
স্প্রিং/সামার ২০২৭-এর মিলান রানওয়েতে চোখের চারপাশে দেখা গেছে গ্লিটার, ক্রিস্টাল, গাঢ় কালো পিগমেন্ট, উজ্জ্বল নীল, গোলাপি, লাইলাক ও মিন্ট সবুজের মতো রঙ। অর্থাৎ মেকআপের উদ্দেশ্য শুধু চোখকে সুন্দর দেখানো নয়; বরং চোখের চারপাশকেই সাজের একটি দৃশ্যমান অংশ হিসেবে তুলে ধরা। ভোগের রানওয়ে বিশ্লেষণেও এই মৌসুমের চোখের মেকআপে গ্লিটার, রঙিন লাইনার ও গ্রাফিক আকৃতির ওপর জোর দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।
মিনিমাল চোখ থেকে একেবারে উল্টো পথে
একসময় চোখের মেকআপের মূল লক্ষ্য ছিল যেন মনে হয়, মেকআপ করেও মেকআপ করা হয়নি। নিউড আইশ্যাডো, পাতলা লাইনার আর স্বাভাবিক রঙের মাসকারা সেই ধারার অংশ।
এবার সেই সংযত সৌন্দর্যের বিপরীতে দাঁড়াচ্ছে আরও প্রকাশ্য, সৃজনশীল চোখের সাজ। চোখের পাতা থেকে শুরু করে ভ্রুর নিচের অংশ কিংবা চোখের নিচের জায়গা—সবই হয়ে উঠছে রঙ ও টেক্সচারের ক্যানভাস।
মিলানের এই পরিবর্তনকে শুধু ‘গাঢ় মেকআপের প্রত্যাবর্তন’ বললে অবশ্য পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। বরং এটি ব্যক্তিত্ব প্রকাশের একটি নতুন সুযোগ। চোখের মেকআপ এবার নিখুঁত হওয়ার চেয়ে দৃশ্যমান ও অভিব্যক্তিপূর্ণ হওয়ার দিকে বেশি ঝুঁকছে।
The Attico-তে চোখজুড়ে ক্রিস্টালের ঝিলিক
The Attico-র রানওয়েতে চোখের চারপাশে ক্রিস্টাল ও গ্লিটারের ব্যবহার নজর কেড়েছে। কোথাও চোখের চারপাশে ছোট ছোট ঝিলমিলে পাথর, কোথাও চোখের পাতাজুড়ে ক্রিস্টালের উপস্থিতি—মেকআপ আর অলংকারের সীমারেখাই যেন কিছুটা মুছে গেছে।
এই লুকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে গ্লিটার শুধু আইশ্যাডোর বিকল্প নয়। এটি চোখের সাজকে একটি অলংকারের মতো করে তুলছে।
বিশেষ কোনো পার্টি, বিয়ে কিংবা সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে তাই সাধারণ কালো বা বাদামি আইশ্যাডোর বদলে চোখের বাইরের কোণে বা নিচের ল্যাশলাইনের কাছে কয়েকটি ছোট ক্রিস্টাল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দৈনন্দিন সাজে পুরো চোখজুড়ে না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সামান্য ঝিলিক রাখলেই লুকটি পরিমিত থাকবে।
Gucci-তে কালো চোখ, নীল পাতা, গোলাপি আন্ডার-আই
Gucci চোখের সাজকে নিয়ে গেছে আরও নাটকীয় জায়গায়। গাঢ় ও স্মোকি কালো পিগমেন্টের পাশাপাশি দেখা গেছে উজ্জ্বল কোবাল্ট নীল আইশ্যাডো এবং চোখের নিচে গোলাপি লাইনার। অর্থাৎ একই সঙ্গে গাঢ়তা, রঙ এবং গ্রাফিক উপস্থিতি—তিনটিই এসেছে চোখের সাজে।
বিশেষ করে কালো স্মোকি আইয়ের প্রত্যাবর্তন মেকআপপ্রেমীদের জন্য পরিচিত হলেও এবার সেটির প্রয়োগ আগের চেয়ে কিছুটা বেশি দৃশ্যমান। চোখের চারপাশে কালো রঙকে ছড়িয়ে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ইন্টেন্স লুক।
অন্যদিকে কোবাল্ট নীল চোখকে দিয়েছে আধুনিক ও সাহসী অনুভূতি। আর নিচের চোখে গোলাপি রঙ যোগ করেছে সেই পরিচিত স্মোকি লুকের মধ্যে অপ্রত্যাশিত একটি পরিবর্তন।
যাঁরা প্রতিদিন কালো আইলাইনার ব্যবহার করেন, তাঁরা চাইলে কালোর বদলে নীল, বেগুনি কিংবা গাঢ় গোলাপি লাইনার দিয়েই এই প্রবণতাকে সহজভাবে অনুসরণ করতে পারেন।
একটু নরমভাবে চাইলে Dolce & Gabbana
সবাই যে চোখে গাঢ় কালো বা ক্রিস্টাল ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ হবেন, তা নয়। তাঁদের জন্য মিলানের আরেকটি দিক বেশ আকর্ষণীয়। Dolce & Gabbana-র বিউটি লুকে দেখা গেছে চোখের নিচে লাইলাক বা হালকা বেগুনি রঙের ব্যবহার এবং ভ্রুর হাড়ের ওপর মিন্ট সবুজের নরম ওয়াশ।
এখানে রঙ আছে, কিন্তু তা খুব চড়া নয়। ফলে যারা রঙিন মেকআপে নতুন, তারা এই ধরনের প্যাস্টেল শেড দিয়ে শুরু করতে পারেন।
লাইলাক আইলাইনারের সঙ্গে খুব হালকা মিন্ট আইশ্যাডো, কিংবা শুধু চোখের বাইরের কোণে সামান্য প্যাস্টেল রঙ—দুটিই হতে পারে দৈনন্দিন সাজে ট্রেন্ডটি অনুসরণের সহজ উপায়।
এবার ব্রাশের বদলে আঙুলও হতে পারে হাতিয়ার
এই ট্রেন্ডের আরেকটি মজার দিক হলো, মেকআপকে খুব বেশি ‘পারফেক্ট’ করার চেষ্টা না করা। বিশেষ করে নরম আইশ্যাডো বা গ্লিটার ছড়িয়ে দিতে আঙুলের ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে।
আঙুলের উষ্ণতায় ক্রিম বা শিমারজাতীয় পণ্য সহজে মিশে যায়। ফলে খুব ধারালো বা কৃত্রিম রেখার বদলে তৈরি হতে পারে নরম, ছড়ানো একটি ফিনিশ।
তবে চোখের কাছে যেকোনো প্রসাধনী ব্যবহারের সময় পরিচ্ছন্নতা জরুরি। সরাসরি পণ্য থেকে আঙুলে নিয়ে ব্যবহার করার আগে হাত পরিষ্কার রাখা এবং চোখে ব্যবহারের উপযোগী প্রসাধনী বেছে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে গ্লিটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে চোখের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে এমন কণা এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে নিজের সাজে আনবেন এই ট্রেন্ড?
রানওয়ের মেকআপ হুবহু অনুসরণ করা জরুরি নয়। বরং সেখান থেকে নিজের জন্য একটি উপাদান বেছে নেওয়াই হতে পারে বুদ্ধিমান উপায়।
অফিস বা দিনের সাজে
নরম লাইলাক, প্যাস্টেল নীল বা মিন্ট সবুজের হালকা ওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন। সঙ্গে খুব স্বাভাবিক লিপ কালার রাখলে চোখই হয়ে উঠবে সাজের প্রধান আকর্ষণ।
সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে
কালো স্মোকি আইয়ের সঙ্গে সামান্য গ্লিটার যোগ করা যেতে পারে। পুরো চোখে গ্লিটার না দিয়ে চোখের মাঝখানে বা ভেতরের কোণে সামান্য ব্যবহার করলেও আলোয় সুন্দর ঝিলিক পাওয়া যায়।
পার্টি লুকে
কোবাল্ট ব্লু বা উজ্জ্বল গোলাপি লাইনার ব্যবহার করা যায়। এর সঙ্গে বাকি মেকআপ অপেক্ষাকৃত সিম্পল রাখলে চোখের রঙটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে
ক্রিস্টাল বা ছোট রাইনস্টোন ব্যবহার করে চোখের বাইরের কোণে অলংকারের মতো একটি ডিটেইল তৈরি করা যেতে পারে। শাড়ি বা গয়নার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে লাইলাক, সিলভার কিংবা হালকা সবুজও বেছে নেওয়া যায়।
শুধু চোখ নয়, বদলাচ্ছে সৌন্দর্যের ভাষাও
মিলানের স্প্রিং/সামার ২০২৭ বিউটি ট্রেন্ডের বড় বার্তাটি সম্ভবত এখানেই—সৌন্দর্য মানেই নিখুঁত, একরকম ও নিয়ন্ত্রিত চেহারা নয়।
রানওয়েতে চোখের মেকআপে রঙ, গ্লিটার ও গ্রাফিক উপাদানের ব্যবহার দেখাচ্ছে, ব্যক্তিত্ব প্রকাশের জায়গা হিসেবে মেকআপকে আরও স্বাধীনভাবে দেখা হচ্ছে। Vogue-এর বিশ্লেষণেও এবারের মিলান সৌন্দর্যধারাকে আগের মিনিমাল প্রবণতা থেকে সরে আরও প্রাণবন্ত ও অভিব্যক্তিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তাই যাঁরা এতদিন শুধু নিউড আইশ্যাডো আর কালো মাসকারাতেই আটকে ছিলেন, তাঁদের জন্য এবার একটু রঙ নিয়ে খেলার সময়। পুরো চোখে নয়, শুরু হতে পারে একটি ছোট্ট লাইলাক লাইনার দিয়ে। তারপর হয়তো একটু শিমার, সামান্য ক্রিস্টাল কিংবা একদিন সাহস করে কোবাল্ট নীল।
কারণ মেকআপের সৌন্দর্য শুধু অন্যকে সুন্দর দেখানোতে নয়—নিজের পছন্দ, মেজাজ ও ব্যক্তিত্বকে একটু অন্যভাবে প্রকাশ করাতেও।
মিলানের রানওয়ে অন্তত সেই স্বাধীনতাটুকুই ফিরিয়ে দিচ্ছে চোখের সাজে।