নাঈম প্রতিদিন সকালে বের হওয়ার আগে বাইরে থেকে দরজাটা লক করে যায়। আমার ঘুমের অসুবিধা হবে ভেবে সে আমাকে ডাকে না। চাবিটা ঘুরিয়ে খুব আস্তে দরজা বন্ধ করে। এত আস্তে যে, অনেক দিন আমি বুঝতেই পারিনি, কখন সে বেরিয়ে গেছে। অথচ প্রতিদিন ঘুম ভাঙার পর মোবাইলে প্রথম যে মেসেজটা দেখি,
‘হ্যালো সি সি।’
ফয়সাল ভাই লেখেন।
তাকে কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি ভালোবাসি। রাত জেগে গল্পও করিনি। কিংবা দেখতে না পেলে অস্থির হয়ে উঠিনি। যোগাযোগ হয় প্রতি সকালে। ঘুম থেকে জেগে মোবাইলটা হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গেলেই একটা মেসেজ পাই, ‘হ্যালো সি সি।’
কখনো সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিই। কখনো বা দেওয়া হয় না। সিন করে বা না করেই ফ্রেশ হই, ব্রেকফাস্ট করি, বারান্দায় গিয়ে গাছগুলোর সঙ্গে কথা বলি। তিনতলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আকাশটাকে দেখার চেষ্টা করি। খোলা বারান্দায় আকাশটাকে যতটা সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, গ্রিলের ফাঁক দিয়ে টুকরো টুকরো, অনেকটা ছোট ছোট বর্গক্ষেত্রের মতো লাগে। দেখে শান্তি পাই না। তারপর নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করি খালার জন্য।
মমতা খালা। বাসার কাজে আমাকে সাহায্য করেন। হাতে একটা ছোট্ট মানিব্যাগ নিয়ে মাথায় শাড়ির আঁচলটা বারবার ঠিক করতে করতে আমার বাসার গেটের কাছাকাছি যখন দেখি তাঁকে, ঠিক তখনই আমি ঘরে ঢুকি।
ঘরে তখন নরম আলো। সোফায়, মেঝেতে, সেন্টার টেবিলের ওপর সেই আলোরা খেলা করে। খালাকে দরজা খুলে দিয়ে বলি, ‘এক কাপ চা দেন আগে।’
আয়েশ করে চা খেতে খেতে ফয়সাল ভাইয়ের টেক্সটের রিপ্লাই দিই।
‘এতক্ষণে সময় হলো সি সি র (কিউট ক্যাট)? ঘুম ভাঙল কখন?’
‘একটু আগেই। কল করব?’
‘করো।’
ফোন রিসিভ করেই জানতে চাইলেন, ‘নাশতা করেছ?’
‘হ্যাঁ, চা খাচ্ছি।’
‘ইস, এত চা খাও তুমি? কয় কাপ খাও প্রতিদিন?’
‘হিসাব নাই।’
‘হাঁটতে যাও নাই?’
‘না, ভালো লাগে না।’
‘হাঁটার অভ্যাসটা করো প্লিজ! আমি তো রিমিকে আর যাই পারি না পারি, হাঁটার অভ্যাসটা করিয়েছি। রিমি এখন ঝড়, বৃষ্টি, শীত-গরম, যাই হোক না কেন, ও হাঁটতে যাবেই।’
রিমি, ফয়সালের ওয়াইফ। তাকে নিয়ে গল্প শুনতে খারাপ লাগে না আমার।
‘ওর তো ইয়োগার ওখানে অনেক বন্ধু। ওরা আবার একসঙ্গে হ্যাংআউট করে, প্রায়ই ইন্টারন্যাশনাল ট্রিপেও ভ্যাকেশনে যায়।’
‘উনারা তো বড়লোক গ্রুপ। আমার অত টাকা নাই, ফয়সাল ভাই।’
‘হুম।’
‘বাই দ্য ওয়ে, আপনি যান না?’
‘যাই তো। ফ্যামিলিকে নিয়ে যাই, আবার ও একাও যায়।’
‘আপনি একা যান না?’
‘না, আমি একা যাই নাই কোনো সময়। একা ভালো লাগে না। রিমি আবার এগুলার ধার ধারে না। ও আমাকে ছাড়া সবখানেই ঘুরে বেড়ায়।’
নাঈমকে ছাড়া আমিও কখনো যাই না। আমারও ভালো লাগে না। ওকে ছাড়া নিজেকে খুব অস্তিত্বহীন মনে হয়। মনে হয়, ও থাকলে আমার যে কেয়ার করত, সেটা হয়তো ওর মতো করে আর কেউ করবে না।
‘তাই বুঝি? একবার গিয়েই দেখো না!’
‘কার সঙ্গে যাব?’
‘আমার সঙ্গেই চলো।’
‘ভাই, আমি আপনাকে খুব ভালো করেই চিনি। আপনি জাতে মাতাল, তালে ঠিক।’
‘এটা কী বললা, বুঝি নাই।’
‘বললাম, রিমি ভাবির ভয়ে এসব ঘুরাঘুরিতে আপনি যাবেন না।’
‘তুমি একবার রাজি হয়েই দেখো না।’
‘ঠিক আছে, দেখা যাক।’
‘আচ্ছা, তুমি ভাবো, ভেবে জানিও। আমি তাইলে এখন রাখি।’
ফোন রাখার পর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে ভাবি, সব কথাই তো কথার কথা। উনি বলে মজা পান, আমারও শুনতে খারাপ লাগে না। এতটুকুই।
নাঈমের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুব সাধারণ। অন্তত বাইরে থেকে দেখলে তাই মনে হবে। কিন্তু আমি অসুস্থ হলে সে-ই সব সময় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায়। একা ছাড়ে না কখনো। হাসপাতালে থাকতে হলে পাঁচ-ছয় দিন একটানা থেকেও একবারের জন্যও আমাকে একা রেখে বাসায় আসে না। ছুটি হলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে তবেই বাড়ি ফেরে। অফিস থেকে ফিরেও ঘরের অনেক কাজ চুপচাপ করে ফেলে, আমার কষ্ট হবে ভেবে।
এই তো মাস তিনেক আগেও জ্বর যখন একটানা তিন দিন ছাড়েনি, নাঈম রাতে অফিস থেকে ফিরেই কপালে হাত দিয়ে বলেছিল, ‘এখনো শরীর এত গরম কেন? ওষুধ খাওনি?’
তারপর নিজেই ওয়াশরুমে গিয়ে বালতিতে করে পানি নিয়ে এলো। একটানা অনেকক্ষণ আমার পাশে বসে থেকে কপালে জলপট্টি দিল। রাতের খাবার আর ওষুধ খাইয়ে দেওয়ার পরও সারা রাত বিছানায় আমার পাশে বসে ছিল, ঘুমালও না ঠিকমতো। সকালে অফিসে বের হওয়ার আগে টেবিলে নাশতা, ওষুধ আর পানির গ্লাস সাজিয়ে সঙ্গে একটা ছোট কাগজে লিখে রেখেছিল, ‘ঘুম থেকে উঠে নাশতা করে ওষুধ খেয়ে নিও।’
লেখাটা পড়ার পর অবাক হয়ে ওটা হাতে নিয়ে বসেছিলাম, অনেকক্ষণ। সেদিন ওর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়নি, আজ পর্যন্তও না।
বিছানায় আধশোয়া হয়ে এসব ভাবতে ভাবতে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, আকাশ মেঘলা করে আছে। মনে হয় প্রচুর বৃষ্টি হবে। রাস্তা পানিতে থৈ থৈ করবে।
এরকমই এক মেঘলা দিনে পরিচয় হয়েছিল ফয়সাল ভাইয়ের সঙ্গে। পরিচয়েরও অনেক আগে থেকেই তাকে আমি জানি। শুনেছিলাম, ভালো লেখেন। তারপর একদিন হঠাৎ করেই বইয়ের স্টলেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। বেশ লম্বা, চওড়া, চশমার ফাঁক দিয়ে সরাসরি তাকান। ‘আপনাকে আমি জানি’ বলতেই বিনয়ের সঙ্গে হাসলেন, হাসিটা মুখ থেকে চোখেও ছড়িয়ে গেল। তারপরই বললেন, ‘আচ্ছা।’
স্টল থেকে বেরিয়ে এলেন। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কী করছি, বাসা কোথায়—এইসব স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছিলেন। মাঝেমধ্যে থেমে হয়তো ভাবতেন, উত্তরটা কীভাবে দেবেন। গলার স্বরটা নিচু, ধীর, যেন প্রতিটা শব্দ মেপে বলেন।
কথা শেষে সেখান থেকে চলে এলাম।
পরদিনই হঠাৎ তাঁর ফোন এলো মেসেঞ্জারে। জানতে চাইলেন, ‘গতকাল মেলা থেকে কখন বেরুলেন? বাসায় ফিরতে ফিরতে নিশ্চয় অনেক রাত হয়েছে।’
‘দশটা বেজে গিয়েছিল।’
‘সেটাই তো স্বাভাবিক। এত দূরে আপনার বাসা!’
‘জি। শাহবাগ থেকে উত্তরা, অনেক দূরে।’
এরকমই খুব সাধারণ কথাবার্তা দিয়ে শুরু। প্রথম দিকে সাহিত্য নিয়ে নানা কথা বলতেন, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথাগুলো শুনতাম। আর অবাক হয়ে মনে মনে ভাবতাম, বিষয়গুলোকে এভাবেও ভাবা যায়! এমন করে ভাবতে পারলে জীবনটা হয়তো আরও অনেক নির্ভেজাল হতে পারত।
এভাবেই সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে নিজেদের ব্যক্তিগত আলাপ শুরু হয়েছিল, মনে পড়ে না।
‘আন্টি, কি ভিজামু? কী রাঁনবেন আইজকা?’ মমতা খালার কথা শুনে ঘোর ভাঙে।
‘খিচুড়ি আর মুরগি করো। সঙ্গে চ্যাপা ভর্তা।’
‘আচ্ছা’, বলে খালা রান্নাঘরে চলে যান।
তারপর বিছানা ছেড়ে পুরো ঘরে হেঁটে বেড়াই। কখনো ড্রয়িংরুমে গিয়ে বুকশেলফের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবি, কত বই! অথচ এখনো পড়া হয়নি অনেকগুলো! তারপরও কেনা হয়।
আজকের এই মেঘলা দিনে কবিতা পড়তে ইচ্ছে করছে। তাই শেলফ থেকে কবিতার বই নামালাম কয়েকটা। বইগুলো নিয়ে সোফায় রাখা কুশনে হেলান দিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ কবিতার বইগুলোর পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ মনে হলো, কাকে যেন খুব মনে পড়ছে! বইটা উপুড় করে সোফার ওপর রেখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই।
আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে কাউকে বলতে ইচ্ছে করছে, আকাশটা খুব মেঘলা হয়ে আছে। বৃষ্টি আসবে। আরও জানতে ইচ্ছে করছে, তোমার অফিস থেকে কি আকাশ দেখা যায়? বৃষ্টি এলে শব্দ শুনতে পাও?
বলা হয় না।
শুধু এই অনুভূতিই নয়, এমন অনেক অনুভূতিই বুকের গভীরে চাপা পড়ে থাকে, কাউকে জানানো হয় না।
মাঝে মাঝে ফয়সাল ভাইকে কল করি। নানা কথার ভিড়ে তাকেও বলা হয় না, আকাশটা মেঘলা, বৃষ্টি নামবে। ভুলে যাই, তা নয়, ইচ্ছে করেই কথাগুলো বলি না। ভাবি, এসব অনুভূতি যাকে জানানো যেত খুব সহজেই, তাকে কেন যেন জানাতে পারি না। কিসের শৃঙ্খলে আটকে থাকি। আর যাকে জানানো যায় না, তাকেই কল করে নানা কথা বলি। অনেক কথার ভিড়ে যা বলতে চাই, তাও যত্ন করে এড়িয়ে যাই।
এই যে যাকে, মানে নাঈমকে, ফোন করার কথা থাকলেও কেন ওকে ফোন না করে ফয়সাল ভাইকে ফোন করি? ফয়সাল ভাইও রিমিকে কল না করে নিয়ম করে আমাকে কল করেন? এর উত্তর আমরা কেউ কখনো খুঁজিনি। খুঁজলে হয়তো উত্তরটা পেয়ে যেতাম। আর উত্তর পেয়ে গেলে তার একটা নাম দিতে হতো। হয়তো সেই নামটা দিতে চাই না বলেই প্রশ্নের উত্তরটাও এড়িয়ে যাই।
আমাদের দুজনের কিছু নিয়ম ছিল। অথচ সেগুলো কখনো প্ল্যান করে তৈরি করিনি। আমরা কখনো দেখা করি না, তাঁর ছুটির দিনগুলোতে ফোনে কথা হয় না। রাত জেগে গল্প করি না। অথচ দিনের আলোতে যখন আর কাউকে খুঁজে পাই না, তখন কেবল তাকেই পাই। স্বেচ্ছায়, মাঝে মাঝে অনিচ্ছায়ও।
একদিন দুপুরে হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে লিখলেন, ‘তোমারে পাইতেছি না, ক্যাট।’
‘খুঁজলেই তো পাবেন।’
‘আমি খুঁজি না? এখন তাইলে কে খুঁজল?’
‘হুম...।’
‘নাটোর যাচ্ছি।’
‘একা?’
‘হ্যাঁ। মাকে আনতে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম এই সপ্তাহে তোমাকে নিয়ে বের হব। হলো না। মা অসুস্থ। তাকে আনতে নাটোর যাচ্ছি। বৃহস্পতি অথবা শুক্রবার ফিরব।’
‘পৌঁছে মেসেজ দিয়েন।’
‘দূরে গেলেই কেন মেসেজ করতে বলিস রে, পাগলি! কাছে এলে কেন দূরে থাকিস! অত দূরে গিয়ে ক্যামনে মেসেজ করব?’
আমি হাসির ইমোজি পাঠাই। উনিও।
টেক্সট করা শেষে মনে হলো, আমি বোধ হয় উনার জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু এই অপেক্ষা কিসের?
দেখার, ছোঁয়ার কিংবা সব সময় কথা বলার জন্য তো নয়। তাহলে, কীসের এই অপেক্ষা?
উনি আছেন। এতটুকুই?
আমাকে আগ্রহ নিয়ে শোনেন, প্রতি কর্মদিবসে ঘুম থেকে উঠে ‘হ্যালো সি সি’ লিখে একটা মেসেজ পাঠান। যাকে বহু প্রশ্ন করলেও বিরক্ত হন না। মেঘলা আকাশ দেখে যাকে কিছু না ভেবেই ফোন করা যায়। কোনো বইয়ের গল্প নিয়ে যার সঙ্গে অনেকক্ষণ সময় ধরে কথা বলা যায়। অযথাই নানা বিষয় নিয়ে তর্ক কিংবা হাসাহাসি করা যায়! এই মুহূর্তগুলোর জন্যই কী অপেক্ষা করি?
‘কী ব্যাপার? ঘুমাবা না?’ নাঈম ঘর থেকে বলল।
‘হুম, আসতেছি।’
রাত তখন দশটা। আমি টিভিটা বন্ধ করে ঘুমাতে যাই। কিন্তু ঘুম আসে না। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করি। মাঝে মাঝে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করি। তবুও ঘুম আসে না। হঠাৎ দেখি মেসেজ এলো।
‘ঘুমিয়ে পড়েছ?’
আমি মেসেজটা সিন করে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে বেরিয়ে যাই। বসার ঘরের ফ্যানটা ছেড়ে আবার বসি। যদিও এই রুমে ইন্টারনেট সমস্যা করে। তবুও এই ঘরেই বসি। বেডরুম থেকে দূরে, নিরিবিলি।
তারপরই ফয়সাল ভাইয়ের মেসেজের রিপ্লাই দিই, ‘না। হঠাৎ রাতে!’
‘কল করো।’
আমি সঙ্গে সঙ্গেই কল করি। জানতে চাইলাম, ‘রিমি ভাবি কোথায়?’
‘ও নেই। আজ গুলশানে ওর বাবার বাড়িতে বেড়াতে গেছে।’
‘তাই তো বলি...! এটা তো আমি আগেই বুঝেছিলাম, হয় আপনি বাসায় নাই, কিংবা ভাবি বাসায় নাই। রিমি ভাবি বাসায় থাকাকালীন আপনি এত রাতে আমাকে কখনোই মেসেজ দিতেন না। দিনেও কখনো দেন না। রাতে তো প্রশ্নই ওঠে না। এজন্যই তো আপনাকে বলি...’
‘কী বলো?’
‘ওই যে, আপনি জাতে মাতাল, তালে ঠিক।’
‘তাই... না?’ হাসতে হাসতে বললেন ফয়সাল ভাই।
‘তা নাইলে কী? অথচ আমারে দেখেন, নাঈম থাকলেও কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে কথা বলি।’
‘উনি কিছু মনে করেন না?’
‘মনে করার মতো কিছু যদি তার চোখে পড়ে, তাইলে হয়তো খবরই আছে। এর আগ পর্যন্ত সমস্যা নাই। সে হয়তো ভাবে, আমার বাসার কারও সঙ্গে কথা বলতেছি কিংবা কোনো ফ্রেন্ডের সঙ্গে। সেজন্যই কিছু বলে না।’
একটু থেমে আবার বললাম, ‘এমনিতেও কার সঙ্গে কথা বললাম, কী করলাম, এগুলা নিয়া চেক করা, আঁড়ি পাইতা শোনা, ওইসবের ধারও ধারে না।’
এমন বহু কথা বলতে বলতে সময় কেটে যায় অনেক। একসময় কথা শেষ করে ঘরে ফিরে যাই। দেখি নাঈম ঘুমিয়ে আছে। ওর হাতটা আমার বালিশের ওপর রাখা। নিঃশব্দে তার হাতের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ি। তারপর অনেকক্ষণ ঘুম আসে না।
সকালে জেগে দেখি বিছানায় নাঈম নেই। দরজার সামনে গিয়ে দেখি, তালা দেওয়া। বুঝতে পারি, ও এতক্ষণে অফিসে চলে গেছে। ফিরে এসে মোবাইলটা হাতে নিয়ে লিখি, ‘ফয়সাল ভাই, গুড মর্নিং।’
কোনো রিপ্লাই আসে না। এই সময়ে উনি সাধারণত পথে থাকেন। অফিসে যান, এই সময়টাতেই। আর গাড়িতে থাকলে রিপ্লাই দেন। কিন্তু আজ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো রিপ্লাই আসছে না।
কিন্তু এখন কারও সঙ্গে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। মনটা একেবারেই ভালো লাগছে না। ঘর গোছাই, বারান্দার গাছগুলোতে সার দিই। অনেক দিন দিব দিব করেও দিতে পারিনি।
বিকেলের দিকে অবশেষে নোটিফিকেশন এলো।
‘আজ সারা দিন খুব ব্যস্ততায় সময় কেটেছে। রিমিকে নিয়ে একটু শপিংয়ে গিয়েছিলাম। ওর অনেকগুলো কেনাকাটা বাকি ছিল। বেশ কিছুদিন থেকেই ও বলছিল, কিন্তু আমি সময় দিতে পারছিলাম না। তাই আজ সারা দিন ওর সঙ্গেই ছিলাম। শপিং শেষে আমাদের উত্তরার ফ্ল্যাটের ওখানে গেলাম। তারপর আরও কিছু কাজ বাকি ছিল। সেগুলোও সারলাম। এসব করতে গিয়ে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। আগামীকাল কথা হবে।’
নিচে লেখা—
‘বাই সি সি।’
অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর ফোনটা পাশে রেখে দিই। উত্তর দিতে ইচ্ছে হলো না।
বিকেলের দিকে নিজে থেকেই লিখি, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো আছি, তুমি? মায়ের শরীরটা এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি, তাই একটু চিন্তায় আছি। আজ ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব। তারপর রিমির সঙ্গে একটু বসতে হবে, ওর বার্থডে এবার বড় করে করব ভাবছি।’
‘আচ্ছা।’
‘তুমি কী করলা সারা দিন?’
‘কিছুই না।’
‘আচ্ছা জাইমা, আমি এখন একটু ব্যস্ত, পরে কথা বলব।’
ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর ফোনটা উল্টো করে টেবিলের ওপর রেখে দিই। বহু দিন পর আজ মনে হলো, কারও কাছে গুরুত্বহীন হয়ে থাকার চেয়ে একেবারে না থাকাই ভালো।
তারপর দিন সকালেও মেসেজ এলো।
‘গুড মর্নিং সি সি। কেমন আছ?’
ঘুম থেকে জেগে মোবাইলটা হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গিয়েও তাঁর ইনবক্সটা ওপেন করতে ইচ্ছে করেনি।
বিছানা ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে চোখে পড়ে—ডাইনিং টেবিলে একটা ভাঁজ করা কাগজ, তার ওপর রাখা ঘরের চাবির তোড়া। কাগজটা খুলে দেখি, নাঈম লিখেছে—
‘আকাশটা আজ মেঘলা। বিকেলে অফিসে চলে এসো। তারপর একসঙ্গে বাসায় ফিরব। ও হ্যাঁ, বের হওয়ার আগে ছাতাটা নিয়ে বেরিয়ো।’
কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। ভাবি—নাঈমকে তো কখনো বলা হয়নি, মেঘলা আকাশ আমাকে অস্থির করে তোলে। টের পাই, হাতের চাপে কাগজটা একটু কুঁচকে গেছে!
জানালার বাইরে তাকাই। দেখি—সত্যিই আকাশটা আজ মেঘলা। কাগজটা টেবিলে রেখেই ফোনটা হাতে নিই। নিজেও জানি না কেন, ফয়সাল ভাইয়ের ইনবক্সেই আঙুলটা গিয়ে থামে।