মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই ইতিহাসের সমগ্র অংশ এখনো আমাদের সামনে অনালোকিতই বলা যায়। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা একটি ভূখণ্ড, একটি মানচিত্র, একটি পতাকা পেয়েছি- এ তথ্যের মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমগ্রতাকে আমাদের মস্তিষ্কে বন্দি করে রেখেছি। কিন্তু এই তথ্য আমাদের বর্তমান প্রজন্মের উপলব্ধি জায়গাকে স্পর্শ করতে পারেনি সেই অর্থে। আর এর ফলাফলও বর্তমান সময়ে দূর্নিরীক্ষ নয়।
৩০ লক্ষ শহিদের তথ্যটি সাংবাদিক ডেভিট ফস্টারকে দেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকারের পূর্বেও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকা এবং ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ৯ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত প্রকাশিত দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পত্রিকার শিরোনাম ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে নির্ভুল প্রমাণিত হলেও যে দু লক্ষ মা বোনের কথা বলা হয়েছে সেই সংখ্যা নিয়ে কোথাও কোনো গবেষণা, উচ্চবাচ্য বা তর্ক-বিতর্ক হয়নি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্যাতন ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হওয়া এই নারীদের সংখ্যা দুই থেকে চার লক্ষ আর ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া যুদ্ধ শিশুর সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ [সূত্র : আই পিপিএফ]।
ইতিহাস, প্রবন্ধ আলোচনায় আমরা তথ্য পাই, মনে রাখি, প্রয়োজনীয় স্থানে ব্যবহার করি এবং দীর্ঘ অব্যবহারে ভুলে যাই। কিন্তু আমাদের মন ও মননকে স্পর্শ করে মানবিক সাহিত্য- গল্প, কবিতা, উপন্যাস। ৩০ লক্ষ শহীদের ত্যাগ আর যুদ্ধজয়ী গাজীদের নিয়ে আমাদের সাহিত্য পরিপূর্ণ। কিন্তু যুদ্ধে নির্যাতিত নারীরা এবং নির্যাতনের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুরা তাদের সমগ্র জীবন নিয়ে উঠে আসেনি আমাদের সাহিত্যে। ফলে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের বোধের জায়গাকে স্পর্শ করতে পারিনি মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে। যার পরিণতি আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান সময়ে।
১৯৭২ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার নারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে ভূষিত করেছিলেন বীরাঙ্গনা উপাধিতে। কিন্তু এই উপাধি নিয়ে আমাদের বীর নারীরা একজন পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার মত মর্যাদা নিয়ে সমাজে বাঁচতে পারেননি। বরং তাদের জীবন পতিত বারাঙ্গনাদের চেয়েও অসম্মানের হয়ে উঠেছিল। আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দিনের আলোয় যাদের পতিতা বলে এক ঘরে করে রাখে, রাতের আঁধারে নিজের শারীরিক প্রয়োজনে তার কাছেই ছুটে যায়। কিন্তু আমাদের যুদ্ধের এই বীর নারীরা নির্যাতনের কারণে যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমাজে অবহেলিত, অস্পৃশ্য, একঘরে হয়ে আমৃত্যু জীবন কাটিয়েছেন। একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য যারা একাত্তরে সম্ভ্রম হারিয়েছেন, সেই ভূখণ্ডে জীবনযাপন করতে গিয়ে তাদের যে আরেক যুদ্ধ, সেই ইতিহাস গল্পাকারে তুলে ধরা হয়েছে ফাল্গুনী তানিয়া সম্পাদিত "রোদন ও আগুনের অক্ষর" গ্রন্থে। এটি যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনা গাথা। ৪৫ জন নবীন ও প্রবীণ লেখকের লেখায় উঠে এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনালোকিত অংশটি। সম্পাদক মহোদয় পূর্বপুরুষের কাছে তার ঋণ পরিশোধের জায়গা থেকে যুদ্ধের পরিপূর্ণ ইতিহাস পৌঁছে দিতে চেয়েছেন বর্তমান প্রজন্মের কাছে, যেন তারা কোন কিছুতেই বিভ্রান্ত না হয়ে বাংলাদেশ জন্মের সমগ্র ত্যাগকে উপলব্ধি করতে পারে এবং তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে পরিণত করতে পারে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে।
গ্রন্থে স্থান পাওয়া ৪৫ টি গল্পের মধ্যে ঝর্না রহমান রচিত "মদিনা বিবির দাফন-কাফন" এবং নাসিমা আনিস রচিত "আমি মেরিনা বেওয়া, মা পচী বেওয়া" গল্প দুটিকে বলা যায় গ্রন্থের থিম গল্প। প্রথম গল্পে আমাদের সমাজে একজন বীরাঙ্গনার জীবনসংগ্রাম এবং দ্বিতীয় গল্পে একজন যুদ্ধ শিশুর নিদারুণ সংগ্রাম উঠে এসেছে। একাত্তরের নির্যাতিত মদিনা বিবি যুদ্ধের তিন মাস পর জন্ম দেয় কন্যা সখিনাকে। সখিনা মদিনা বিবির স্বামীর ঔরসজাত সন্তান হলেও সমাজ সেকথা বিশ্বাস করে না। ফলে কন্যা সমেত মদিনা বিবিকে হতে হয় এক ঘরে। গ্রামের এক প্রান্তে, জঙ্গলের ধারে এক প্রবাসীর পতিত জমির একটি পরিত্যক্ত ঘরে তাদের স্থান হয়। বাড়ির পাশের এক টুকরো পতিত জমিতে শাকসবজি লাগিয়ে, হাঁস-মুরগি পালন করে তাদের সংসার চলে। গ্রামের কোনো শুভ কাজ, আচার অনুষ্ঠানে তাদের ডাক পড়ে না। গ্রামের সবার ঘরে বিদ্যুৎ থাকলেও চন্দ্র-সূর্যই ওদের ঘর আলোকিত করে। সখিনার মেয়ে ছোট্ট মায়মুনা জানে না , কেন শুধু ওদেরই জন্য এই নিয়ম। বীরাঙ্গনার সন্তান বলে সখিনা বিবি হয় স্বামী পরিত্যক্তা। ছোট্ট মায়মুনা বঞ্চিত হয় তার স্বাভাবিক শিশু জীবন থেকে। কেবল মক্তবে সে অন্য শিশুদের সাথে পড়তে পারে কারণ আল্লাহর কালামে সবার অধিকার আছে কিন্তু মানুষের তৈরি সমাজে সব মানুষের অধিকার নেই। তাই ২০০৮ সালে কান্নাহীন, বিলাপহীন, জনসমাগমহীন মদিনা বিবির মৃত্যুর মতো এমন মৃত্যু মায়মুনা জীবনে কখনো দেখেনি। একাত্তরে নির্যাতন কালে সন্তান সম্ভবা বলে মদিনা বিবির অনাগত সন্তানের খাদ্য ভাণ্ডার দুটি কেটে নেয় পাক পিশাচেরা । মায়ের দুধের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে সখিনা বিবি তার মা ও মেয়েকে লুকিয়ে রাখে লোকচক্ষুর অন্তরালে, অন্ধকার গৃহকোণে । বীরাঙ্গনার অমানুষিক জীবন সমাপ্ত করে মদিনা বিবি যখন কবরে নামবেন, তখনো গ্রামের মুন্সি শরফু মিয়া ফতোয়া দেয়- অপবিত্র বীরাঙ্গনার জানাজা হবে না। তার কোনো ধর্ম নেই, কাজেই ধর্মীয় নিয়মে তার শেষকৃত্যও নেই। কৃত্যানুষ্ঠানহীন মাটি চাপাই হবে তার পাপের জীবনের পরিপূর্ণ সমাপ্তি। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই, ফ্যান্টাসির জগতের নায়কের মত মদিনা বিবির অসম্মানিত জীবনকে সম্মানের জায়গায় পৌঁছে দিতে অকস্মাৎই আবির্ভূত হন উপজেলা শিক্ষা অফিসার - হাবিব উদ্দিন। সরকারি লোক পরিচয় পেয়ে থেমে যায় শরফু মুন্সির হুংকারও। জানাযায় উপস্থিত হয় গ্রামের গণ্যমান্য লোকেরা। অন্যান্য মৃত মানুষের মত আলোচনা হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধে মদিনা বিবি ও তার স্বামী ও শ্বশুরের আত্মত্যাগের গল্প। বড় হুজুরের নেতৃত্বে সম্পন্ন হয় তার জানাজা।যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মানে শেষ বিদায় সম্পন্ন হয় মদিনা বিবির।
একজন শিক্ষা অফিসার, সরকারি লোক, একটি কণ্ঠস্বর এত বছর ধরে চলে আসা সমগ্র গ্রামের নিয়ম পরিবর্তন করে দেয় মুহূর্তেই। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের বীরাঙ্গনাদের এই অমানুষিক নির্যাতিত জীবন তৈরিতে রাষ্ট্র স্বয়ং ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্র যদি চাইতো, তবে হাবিবউদ্দিনেরা ছড়িয়ে পড়তেন বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামে, পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের মত করে খুঁজে বের করতেন নারী মুক্তিযোদ্ধাদের, তাদের সম্মানিত করতেন সামাজিকভাবে, ভাতার মাধ্যমে তাদের পরিবারকে সচ্ছল করতেন আর্থিকভাবে। রাষ্ট্রীয় অবহেলাতেই যুদ্ধ থেকেও ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জীবন অতিবাহিত করেছেন আমাদের বীর নারীরা এই স্বাধীন দেশে।
বীরাঙ্গনার সন্তান সখিনা ও নাতি মায়মুনার জীবনচিত্রের মতো একই জীবন চিত্র আমরা দেখি বীরাঙ্গনা পচী বেওয়ার সন্তান মেরিনা বেওয়া ও তার সন্তানদের ক্ষেত্রে। তারাও সমাজে এক ঘরে। সকাল-সন্ধ্যা, বারবেলায় তাদের মুখ দেখা অকল্যাণের। যুদ্ধশিশুর মর্যাদার জন্য লড়াই রত মেরিনা বেওয়া মানুষের সমাজ থেকে পরিত্যক্ত হয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৈফিয়ত চেয়েছে,- " আমার আলো -বাতাস-পানি তুমি সবার চেয়ে আলাদা করে রাখলে একই মাটিতে জন্ম নেওয়ার সত্ত্বেও।" যুদ্ধশিশুর স্বীকৃতিপত্র এলে তার সকল অসম্মান দূর হবে। তার মায়ের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সবুজ দেশ। স্রষ্টার কাছে তার জিজ্ঞাসা- "কাগজটা এলে কি আমি এর অংশ হব আর সকলের মতো! আমায় বলবে, বেশ এবার তুমি আমাদের হলে! সকল গ্লানি অপমান কুৎসা মুছে গেল!" এই গ্লানি-অসম্মান মেরিনার সন্তানদের জন্যও। তাইতো এই স্বীকৃতি পত্রে তাদেরও প্রত্যাশা, -"মাগো সব খারাপের এবার শেষ হবে মা, মাথা উঁচু করে তুমি এবার রাস্তা দিয়ে হাঁটবে।...তোমাকে আর বলবে না,জারক সন্তান তোর আবার কথা কি! আমাদেরকে বলবে না, জারকের সন্তান তুই, তোর আবার কথা কি!" কি নিদারুন, নির্মমতার মধ্য দিয়ে আমাদের বীর নারীরা এবং তাদের সন্তান-সন্ততিরা জীবন অতিবাহিত করেছে আমাদের এই দেশে। অন্ধ, বিবেকহীন, পক্ষপাতদুষ্টু এই রাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধশিশু মেরিনা বেওয়ার তাই সদম্ভ প্রশ্ন, -" আমি, আমার মা আমরা যুদ্ধের কে! যুদ্ধের কোন অংশে আমাদের অবস্থান! যাদের যুদ্ধ অর্ধশতক পরেও শেষ হয় না, প্রাত্যহিক লাঞ্ছনার মর্মন্তুদ পীড়নে যারা পর্যুদস্ত!" স্বাধীন দেশে বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছে ২০১৫ সালে। পিতার নাম ছাড়া যুদ্ধশিশুরা এদেশের নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে ২০২২ সালে। তাই আমরা দেখি, গল্পে পিতার নামের জায়গায় অজ্ঞাত লিখে রাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধশিশুর মর্যাদা আদায় করতে মেরিনা বেওয়ার লেগে যায় চার বছর! ছুটতে হয় রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, সিরাজগঞ্জ। সমস্ত জীবনের লাঞ্ছনা আর চার বছরের অমানুষিক পরিশ্রমে অর্জিত মেরিনা বেওয়ার স্বীকৃতি পত্র স্বাধীন বাংলাদেশকে মানুষের গালে সজোরে চপেটাঘাতের মতই- ‘‘স্বাধীনতার স্মারক আমি। আমি মানেই বাংলাদেশ।... আমি মানেই পিশাচদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা লাল সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশ।’’
দীপেন ভট্টাচার্যের ‘‘লার্স নিউগোর’’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের আরেকটি প্রান্ত উন্মোচিত করেছে। নরওয়েতে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশী যুদ্ধশিশু লার্স নিউগোরের জন্মদাত্রী মা বীরাঙ্গনা রাবেয়া। যে বীরাঙ্গনারা যুদ্ধের পুরোটা সময় অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে বেঁচে ছিল এই আশায় যে স্বাধীন দেশে তাদের উপর নির্যাতনকারীর উপযুক্ত বিচার হবে। বাস্তবে ঘটেছে সম্পূর্ণ তার উল্টো। তাই নির্যাতনের ফলে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা রাবেয়া নিজের ভেতর ন্যায্যতার যে জগৎ গড়ে তুলেছিলেন সেখানে শাস্তি দেওয়া হয়েছে তার উপর নির্যাতনকারীদের। চোখের সামনে নির্মম হত্যার শিকার ছোট ভাই রাহাত তার জগতে হয়ে উঠেছিল বীরাঙ্গনাদের উদ্ধারকারী মুক্তিযোদ্ধা। মৃত্যু জীবনের ট্রাজেডি নয় বরং বেঁচে থেকে মৃত্যু কষ্ট ভোগ করাই প্রকৃত ট্রাজেডি। যে ৩০ লক্ষ বীর যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন, আমাদের গাজী মুক্তিযোদ্ধারা আর প্রতিশোধ নিয়েছেন, দেশ স্বাধীন করেছেন। কিন্তু যে চার লক্ষ নারী নির্যাতিতা হয়েছেন, তাদের মানসিক অবস্থা কেউ বোঝেনি। তাদের নির্যাতনকারীদের বিচার করার কথা কেউ ভাবেনি। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তারা ফিরে গেছে নিজ দেশে, সাগৌরবে। তাই জীবান্মৃত বীরাঙ্গনারা বাস্তবতার বিপরীতে নিজেদের তৈরি জগতে শাস্তি দিয়েছেন তাদের স্বাভাবিক জীবন হত্যাকারীদের। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকটি হলো স্বাধীন দেশে এই বীরাঙ্গনাদের বাঁচার কোনো ব্যবস্থা আমরা করিনি। বরং ইতিহাস থেকে তাদের মুছে ফেলতে চেয়েছি চিরতরে। তাই’৭৫ এ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যার পরে বন্ধ হয়ে যায় এসব বীরাঙ্গনাদের জন্য তৈরি পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো। জীবনের এতো নির্মমতা সহ্য করতে না পেরে ভারসাম্যহীন রাবেয়া আত্মহত্যা করে লজ্জা দিয়ে যায় আমাদের স্বাধীনতাকে।
গল্পে কেবল পূর্বপাকিস্তানে অবস্থানরত নারীদের নির্যাতিত জীবনই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানে যেসব বাঙালি পরিবার আটকে পরেছিলেন, এমনকি সরকারের উচ্চপর্যায়ে কর্মরত ব্যক্তি ও তাদের স্ত্রী-কন্যারা পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতন থেকে রক্ষা পান নি, সেই চিত্রও উঠে এসেছে ফরিদুর রহমানের "কোয়েটার বন্দী শিবির থেকে" গল্পে। রাওয়ালপিন্ডিতে কর্মরত বাঙালি ডেপুটি সেক্রেটারির কন্যা লাবণ্যের জবানিতে আমরা জানতে পারি, তাদের পুরো পরিবারের উপর ঘটে যাওয়া নির্মম কাহিনী। তবে আমরা দেখি নিউগোর, লাবণ্যরা নিজেদের উপর ঘটে যাওয়া অবিচারের ইতিহাস পৃথিবীকে জানানোর দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজেদের কাঁধে। যে কাজ করার কথা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকের, আমাদের নিশ্চুপতায়, অকৃতজ্ঞতায় সেই কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধ শিশুরা। আদনান সৈয়দের ‘‘দাদির নীল স্যুটকেস’’ গল্পেও যুদ্ধশিশু রাকিব খান ও তার ছেলে নাবিল একই ব্রত নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন।
শুধু পাকবাহিনীর নির্মমতাই নয়, তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদরদের কাহিনী ও যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের সম্মানিত জীবন উঠে এসেছে জান্নাত লাবণ্যের ‘‘মা’’ গল্পে। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর অর্থাৎ ৭ মার্চ ১৯৭১ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ একজন বীরাঙ্গনা ও পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার বিপরীত জীবনচিত্র উঠে এসেছে সঙ্গীতা ইমামের "সুদূরের শুকতারা" গল্পে। রঞ্জনা ব্যানার্জীর "চোখ" গল্পটি ভিন্ন কাহিনিতে অনন্য। নীল চোখের বাংলাদেশী নীলাঞ্জনা সব সময় সেই চোখে কেবল প্রেম-ই বিলায় না, কখনো কখনো সেই চোখ দুঃসহ স্মৃতিকেও মনে করিয়ে দেয়। গল্পকথক শ্যামা যখন জানতে পারে আইরিশে মেলানিনের অভাবেই চোখের রং ভিন্ন হয় না বরং পূর্ব পুরুষের জিনগত বৈশিষ্ট্যকেও তা প্রকাশ করে কখনো কখনো , তখন তার নিজের কাছে নিজের জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। যুদ্ধশিশু বিপ্লব ও তার মেয়ে শ্যামার নীল চোখ বীরাঙ্গনা মানসীর যুদ্ধপরবর্তী সমগ্র জীবন কাঁটার বেড়ার মতো ঘিরে ছিল এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়েই মানসী সেই বেড়া ডিঙিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন। বীরাঙ্গনা জোবেদার এক দুর্ধর্ষ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে কুদরাত-ই-নূর এর "চামুন্ডা আখ্যান" গল্পে। আর্মি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে জোবেদার কালী মন্দিরের সামনে ভয়ংকর কালী মূর্তি ধারণ করে রাজাকার কমান্ডার সাদিক মুন্সিকে মুহুর্মুহু কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সম্পাদক তার সম্পাদকীয়তে যদি বলে না দিতেন যে গল্পটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত তবে হয়তো পাঠকের মনে এর সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগত। এরকম অসংখ্য অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে ‘‘রোদন ও আগুনের অক্ষর’’ গ্রন্থের এক একটি গল্প।
গ্রন্থটি একটি ফরমায়েসি গ্রন্থ। সম্পাদক আমাদের যুদ্ধের একটি বীভৎস দিক তুলে ধরতে চেয়েছেন এ প্রজন্মের সামনে। ফলে বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে শিল্প সৌন্দর্যের দিকে নজর দিতে পারেননি কোনো কোনো গল্পকার। কিশোরদের উপযোগী করে গল্প রচনা করতে গিয়ে গল্পের মধ্যে বীভৎস রস পরিত্যাগ করে করুণ রসের প্রাধান্যর কথা সম্পাদক মহোদয় বললেও প্রকৃত কাহিনী তুলে ধরতে গিয়ে কোনো কোনো গল্পকার নির্যাতনের ভয়াবহ বীভৎসতাকে একেবারে এড়িয়ে যেতে পারেননি। তথাপি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে করুণ ও বীভৎস অংশ যাকে আমাদের যুদ্ধের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ত করে স্বাধীনতার প্রকৃত ত্যাগকে খণ্ডিত করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে ইতিহাসে, সম্পাদক মহোদয় সেই জায়গাতে দৃষ্টি দিয়েছেন। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই গ্রন্থের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রকৃত ত্যাগকে উপলব্ধি করে, এ দেশকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেদের যথার্থ ভূমিকাটা নির্ণয় করতে পারবে আশা করি।
আলোচক: আমিনা আক্তার লিপি
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ
ঢাকা/আরএস