বেলুচিস্তানের অগ্নিকন্যা মাহরাং বেলুচ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬

বেলুচিস্তানের অগ্নিকন্যা মাহরাং বেলুচ

রোদসী ডেস্ক:


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ‘বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র’ নামে একটি বিবৃতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেলুচিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং অঞ্চলটির ৮৫ শতাংশের বেশি অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আরও বলা হয়েছে, বেলুচিস্তান ইতিমধ্যে নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, নতুন মুদ্রা এবং স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছে। যদিও এসব দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা যাচাই এখনো মেলেনি, তবু এই বিবৃতি নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে বহু দশকের বেলুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে। সেই আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত মুখ এখন ডা. মাহরাং বেলুচ—শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের প্রতীক, যিনি গুম, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বেলুচ জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বেলুচদের আন্দোলন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন মাত্রা পেয়েছে।


পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত দেশটির বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান। এর অধিবাসী বেলুচরা মূলত স্বাধীনচেতা যাযাবর সম্প্রদায়। ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশরা তাঁদের ভূখণ্ড দখল করে। পরবর্তী সময়ে অঞ্চলটি পাকিস্তানের অংশে অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ বেলুচ পাকিস্তানে এবং আরও প্রায় ২০ লাখ ইরান, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে।


প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, সোনা ও অন্যান্য খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ঘিরে সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষের অভিযোগ, তাঁদের সম্পদ ব্যবহৃত হলেও উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে তাঁরা বঞ্চিত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেলুচিস্তানের সংকট ও সম্ভাব্য সমাধান তুলে ধরতে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের অন্যতম ডা. মাহরাং বেলুচ।


মাহরাং বেলুচ বর্তমানে বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটির প্রধান। মানবাধিকার রক্ষা ও বেলুচ জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বোলান মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করা একজন চিকিৎসক। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি মানবাধিকার আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে বেলুচিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত করেছে।


২০২৩ সালে বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে বেলুচিস্তান থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। সেই কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন মাহরাং বেলুচ। এই পদযাত্রা শুধু বেলুচিস্তানের নয়, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসেও অন্যতম আলোচিত শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হয়।


মাহরাং বেলুচের আন্দোলনের পেছনে রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত বেদনা। চল্লিশের দশক থেকে বেলুচিস্তানে স্বাধীনতা ও অধিকারের দাবিতে একাধিক আন্দোলনের ঢেউ বয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০০৩ সালের পর থেকে জোরপূর্বক গুম, নাগরিক নিপীড়ন ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযানের অভিযোগ ব্যাপকভাবে সামনে আসে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) ও বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্টের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন জানান বা সেগুলোতে যোগ দেন।


মাহরাংয়ের বাবা আবদুল গাফফার ল্যাঙ্গোভ বিএলএর সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সালের ২ ডিসেম্বর করাচিতে হাসপাতালে যাওয়ার পথে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ। তখন মাহরাংয়ের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। বাবাকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে সে সময় থেকেই প্রতিবাদ শুরু করেন তিনি। প্রায় দেড় বছর পর, ২০১১ সালের জুলাইয়ে বাবার মরদেহ উদ্ধার হয়।


পরিবারের ওপর নিপীড়ন সেখানেই থেমে থাকেনি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে মাহরাংয়ের ভাইকে বেলুচ লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। তিনি সে সময় ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।


যদিও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, মাহরাং বেলুচ নিজে ধারাবাহিকভাবে অহিংস আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘জাতি, ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাসনির্বিশেষে আমরা যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাই।’


তবে বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের তথ্যমতে, গত বছর বেলুচিস্তানে ১৭০টি জঙ্গি হামলা হয়। এসব হামলায় ১৫১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১১৪ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। এই বাস্তবতা দেখায়, অঞ্চলটি এখনো সহিংসতা ও সংঘাতের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।


অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বেলুচিস্তানে নারীরাও দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার। অভিযোগ রয়েছে, অনেক মেয়েদের স্কুল সামরিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। ধর্মীয় উগ্রবাদও নারীদের অবস্থাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৩ সালের লংমার্চের আগে ইসলামাবাদে মাহরাং বেলুচ ও অন্যান্য নারী কর্মীরা হয়রানি, শারীরিক আক্রমণ, অপমানজনক আচরণ এবং প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি গ্রেপ্তারের পর তাঁদের স্কার্ফ খুলে নেওয়া এবং আন্দোলনকারী নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগও রয়েছে।


তবে বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ স্বাধীনতার সম্ভাবনার কথা বলছেন, আবার কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক সমাধান, সাংবিধানিক সংস্কার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আসতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—ডা. মাহরাং বেলুচ আজ শুধু একজন আন্দোলনকারীর নাম নয়; তিনি বেলুচ জনগণের ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও অধিকারের দাবির একটি শক্তিশালী প্রতীক।


তথ্যসূত্র: আলজাজিরা

sidebar ad