বৃষ্টির দিনে স্বাস্থ্যকর গরম পানীয়

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬

বৃষ্টির দিনে স্বাস্থ্যকর গরম পানীয়

শায়লা জাহান


আকাশভরা কালো মেঘের আনাগোনা আর জানালার পাশে বসে টুপটাপ বৃষ্টির ছন্দ শুনতে শুনতে অজান্তেই মন খুঁজে ফেরে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ উষ্ণ পানীয়। সেই উষ্ণতা শুধু হাতের তালুতে নয়, ছড়িয়ে পড়ে মনজুড়েও। তবে বর্ষার দিনে গরম পানীয়ের প্রয়োজন কেবল অনুভূতির জন্যই নয়, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা বা ঠান্ডাজনিত নানা সমস্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টিগুণে ভরপুর কিছু স্বাস্থ্যকর গরম পানীয় হতে পারে বর্ষার দিনের সেরা সঙ্গী। যা মনকে দিবে প্রশান্তি, আর শরীরকে রাখবে সতেজ ও সুস্থ।  


ঘরে বসে এই পানীয় তৈরি করলে তো আরও ভালোই। ঘরে তৈরি এই পানীয় অধিক স্বাস্থ্যকর ও সতেজ হওয়ায় খুব সহজেই এগুলো প্রস্তুত করতে পারেন। এছাড়াও এতে ব্যবহৃত উপাদানের উপর আপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে, পন্যগুলোতে কোন বাড়তি চিনি বা প্রিজারভেটিভ থাকে না এবং এটা সাশ্রয়ী ও প্যাকেটজাত পানীয়ের উপর নির্ভরতা কমায়। আসুন বর্ষাকে উপভোগ করার মতো এমন কিছু সহজ ও স্বাস্থ্যকর পানীয়ের কথা জেনে নিই-


আদা চা

চা বাঙালির শুধু একটা পানীয় নয়, এটি আবেগ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকালের ঘুম ভাঙ্গানো থেকে শুরু করে আড্ডা, ক্লান্তিতে স্বস্তি কিংবা অতিথি আপ্যায়নে চায়ের কোন বিকল্প নেই। বৃষ্টির দিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং উপকারী পানীয় এটি। সাধারণত তাজা আদা দিয়ে তৈরি আদা চা পাকস্থলীকে উষ্ণ রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এতে মধু মেশালে চা সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত হয়ে ওঠে, যা সর্দি- কাশি দূর করতে এবং শরীরে উষ্ণতা জোগাতে সাহায্য করে। আদায় রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান, যা গলা ব্যথা ও সর্দি কমাতে দারুণ কাজ করে। ফুটন্ত পানিতে আদা কুঁচি দিয়ে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিন। কাপে ঢালার পর সামান্য লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে গরম গরম উপভোগ করুন।    


তুলসি- দারুচিনির হারবাল চা

বাঙালির ঘরে ঘরে তুলসী পাতার গুণাগুণ সবার জানা। বৃষ্টির স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে তুলসি -দারুচিনির এই কম্বিনেশন দারূণ কাজ করে। এই দুটিই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ। এই হারবাল চা ঠান্ডা-কাশির সময় আরাম দিতে পারে এবং শরীরের ক্লান্তি কমাতেও সহায়ক। চাইলে এতে একটি লবঙ্গও যোগ করতে পারেন। 


হলুদ দুধ

রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস হলুদের দুধ বৃষ্টির রাতের আমেজটাই বদলে দিতে পারে। কাঁচা হলুদ বা হলুদের গুঁড়োয় থাকা কারকিউমিন প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডি হিসেবে কাজ করে। এক গ্লাস গরম দুধে এক চা চামচের চার ভাগের এক ভাগ হলুদের গুঁড়ো, সামান্য দারুচিনির গুঁড়ো এবং মিষ্টির জন্য মধু বা গুড় মিশিয়ে নিন। শরীরের যেকোন ব্যথা কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং চমৎকার ঘুম হতে সাহায্য করে। এই পানীয় যেন এক কাপ লিকুইড সানশাইন যা ঘুম ভালো করার পাশাপাশি ত্বককেও করে উজ্জ্বল। 


রোজমেরি টি

যারা শরীর ও মনকে চনমনে করে তোলার মতো পানীয় খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি চমৎকার। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রদাহ প্রতিরোধী গুণাগুণসম্পন্ন এই চা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি এবং মানসিক ক্লান্তি দূর করার জন্যও পরিচিত। 


গ্রিন টি

যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান এবং একই সাথে বৃষ্টির আমেজ উপভোগের সাথে যারা হালকা পানীয় পছন্দ করেন তাদের জন্য এটি সেরা পছন্দ। মেটাবলিজম বাড়ায় এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর হওয়ায় শরীরকে ডিটক্সিফাই করে। এতে শরীর থাকে সতেজ ও ঝরঝরে। 


পুদিনা চা

ফুটন্ত পানিতে পুদিনা পাতা দিয়ে তাজা পুদিনা চা তৈরি করুন। হালকা ও সতেজকারক এই পানীয়টি  হজমে সহায়তা করে এবং ভারী খাবারের পর পাকস্থলীকে আরাম দিতে দারুণ কার্যকর। 


হট কোকো বা হট চকলেট

যারা চা-কফির বাইরে কিছু খেতে চান বৃষ্টির দিনে এক কাপ হট কোকো হতে পারে আপনার দূর্দান্ত চয়েজ। এই হট কোকো পান করা কেবলই যে আরামদায়ক একটি অভিজ্ঞতা তা নয়, বরং এর রয়েছে নানাবিধ স্বাস্থ্যগুণ। বিশুদ্ধ কোকোতে ফ্ল্যাভোনয়েড, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, পিইএ, থিওব্রোমিন এবং ক্যাটেচিনের মতো মূল্যবান পুষ্টি উপাদান থাকে। এসব উপাদান শরীরকে সুরক্ষা দিতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে, মেজাজ ভালো করতে এবং শক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। কোকো আপনার ক্লান্তি ও মানসিক চাপ দূর করে মনকে প্রফুল্ল করে তুলতে সাহায্য করবে। তাই নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে এক কাপ হট কোকো উপভোগ করুন এবং আপনার সব দুশ্চিন্তাকে দূরে সরিয়ে দিন। 


গরম সবজির স্যুপ

যদিও এটা সরাসরি পানীয় নয়, পানীয় ও খাবারের মাঝামাঝি; তবুও বর্ষার দিনে এটি দারুণ স্বাস্থ্যকর একটি বিকল্প। গাজর, টমেট, কুমড়া, ব্রোকোলি বা অন্যান্য মৌসুমি সবজি দিয়ে তৈরি স্যুপ শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের যোগান দেয়। 


বোন ব্রোথ

খাবার  পানীয়ের মাঝামাঝি আরেকটি খাবার হলো বোন ব্রোথ। নিয়মিত বোন ব্রথ পান করলে তা আপনার অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে এবং এর পাশাপাশি আরও কিছু উপকারিতাও প্রদান করতে পারে। 


কিছু সতর্কতা


- অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন। সাদা চিনির বদলে মধু, গুঁড়, বা মিছরি ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি উপকারী। 


- দিনে বারবার দুধ চা বা কফি পান না করে হারবাল পানীয় বেছে নিন।


- মধু কখনো ফুটন্ত গরম পানিতে মেশাবেন না। পানি একটু ঠান্ডা হলে মেশান।


- তড়িঘড়ি করবেন না। প্রতিটি পানীয় ধীরে ধীরে, ছোট চুমুকে উপভোগ করুন।


- বৃষ্টির দিনে শরীরে পানিশূন্যতা হয় না ভেবে ভুল করবেন না। এসব পানীয়ের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। 


- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগ থাকলে পানীয় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। 


ঝুম বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে আজই বানিয়ে ফেলুন আপনার পছন্দের কাপটি। সুস্থ থাকুন, সুরক্ষিত থাকুন। 


ঢাকা/শায়লা/লিপি

sidebar ad