গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে স্তনের পরিবর্তন অন্যতম। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রস্তুতি হিসেবে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে স্তনের দুধ তৈরির প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় স্তনের যত্ন নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি প্রসবের পরও স্তন ও স্তনবৃন্তের পরিচ্ছন্নতা এবং সঠিকভাবে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
১. গর্ভাবস্থায় স্তনের যত্ন কীভাবে নেবেন?
গর্ভাবস্থার শেষ দিকে স্তন থেকে সাদা বা হলুদাভ তরল বের হতে পারে। একে কলোস্ট্রাম (শালদুধ) বলা হয়। এটি নবজাতকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দুধ এবং সাধারণত গর্ভাবস্থায় এর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
স্তনবৃন্তে কলোস্ট্রাম জমে থাকলে পরিষ্কার পানি দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করা যেতে পারে। অতিরিক্ত সাবান বা শক্তভাবে ঘষাঘষি না করাই ভালো। দিনের বেলায় যদি বেশি পরিমাণ তরল বের হয়ে অস্বস্তি হয়, তাহলে পরিষ্কার ব্রেস্ট প্যাড ব্যবহার করা যেতে পারে।
গর্ভাবস্থার দ্বিতীয়ার্ধ থেকে স্তনের আকার পরিবর্তিত হতে থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রা পরিবর্তন করা জরুরি। এমন ব্রা ব্যবহার করা উচিত, যা স্তনকে নিচ থেকে ভালোভাবে সমর্থন দেয়, কিন্তু অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে না। সুতি ও আরামদায়ক অন্তর্বাস ব্যবহার করা ভালো।
২. গর্ভাবস্থায় স্তনের যত্নে কী করবেন?
গর্ভাবস্থায় স্তনের ত্বক টান পড়ার কারণে স্ট্রেচ মার্ক বা ফাটল দেখা দিতে পারে। এ সময় কুসুম গরম পানিতে গোসল করা এবং গোসলের পর ত্বক আর্দ্র রাখতে উপযোগী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্তনের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে গেলে অস্বস্তি ও চুলকানি বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় নিরাপদ ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম বা তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে স্তন শক্ত বা ঝুলে যাওয়া ঠেকাতে ঠান্ডা পানি দিয়ে বারবার ধোয়া বা জোরে ম্যাসাজ করার প্রয়োজন নেই। স্তনের আকার ও আকৃতির পরিবর্তন গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের স্বাভাবিক অংশ। তাই এ নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা না করে আরামদায়ক ও সহায়ক অন্তর্বাস ব্যবহার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন স্বাভাবিক গোসলের সময় স্তন পরিষ্কার রাখা এবং ত্বকের যত্ন নেওয়া যথেষ্ট। অতিরিক্ত ঘষাঘষি, শক্ত সাবান বা সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার না করাই ভালো।
৩. প্রসবের পর স্তনের যত্ন কীভাবে নেবেন?
প্রসবের পর শিশুকে সঠিকভাবে ও নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো স্তনের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় দুধ জমে থাকলে স্তনে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই শিশুর চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত।
বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মা যতটা সম্ভব স্বস্তিতে ও আরাম করে থাকবেন। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ মায়ের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে এবং দুধ বের হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
স্তনবৃন্তে ব্যথা বা ফাটল দেখা দিলে তার অন্যতম কারণ হতে পারে শিশুর ভুলভাবে স্তন ধরা। শিশুকে শুধু স্তনবৃন্ত নয়, স্তনবৃন্তের চারপাশের গাঢ় অংশের (অ্যারিওলা) বড় অংশসহ মুখে নিতে সাহায্য করতে হবে। শিশুর সঠিক ল্যাচ বা স্তন ধরার কৌশল নিশ্চিত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে স্তনবৃন্তে ব্যথা ও ক্ষত হওয়ার ঝুঁকি কমে।
স্তনবৃন্তে ক্ষত বা ফাটল দেখা দিলে জায়গাটি পরিষ্কার ও শুকনো রাখা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ক্ষত থেকে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। এ ধরনের সমস্যা হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৪. ‘মিল্ক ফিভার’ বা দুধ জমে জ্বর কী?
স্তনে দুধ জমে গেলে কখনো কখনো স্তন ফুলে যাওয়া, শক্ত হয়ে যাওয়া, ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। এর সঙ্গে মায়ের জ্বরও থাকতে পারে। তবে জ্বরকে শুধু ‘দুধের জ্বর’ ধরে নিয়ে অবহেলা করা ঠিক নয়। স্তনে সংক্রমণ বা মাস্টাইটিসসহ অন্যান্য সমস্যার কারণেও জ্বর হতে পারে।
বিশেষ করে স্তন লাল বা ফুলে গেলে, তীব্র ব্যথা হলে, জ্বালাপোড়া থাকলে কিংবা শরীরে জ্বর, কাঁপুনি বা দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্তনবৃন্তে ফাটল বা ক্ষত থাকলেও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এমন সমস্যা হলে নিজের সিদ্ধান্তে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ না করে চিকিৎসক বা স্তন্যদান-বিষয়ক প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া ভালো। প্রয়োজন হলে দুধ বের করে শিশুকে খাওয়ানোর উপযুক্ত পদ্ধতিও তারা জানাতে পারেন।
গর্ভাবস্থা ও প্রসবের পর স্তনের কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক। স্তন থেকে কলোস্ট্রাম বের হওয়া, স্তনের আকার পরিবর্তন কিংবা সামান্য অস্বস্তি অনেক সময় শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের অংশ। তবে তীব্র ব্যথা, অস্বাভাবিক ফোলা, লালচে হয়ে যাওয়া, পুঁজ বা ক্ষত, অথবা জ্বর দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সূত্র: সারকারোনাল ডটকম