মানুষের জীবনে সাফল্য, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা অর্জনের পথ কখনোই সহজ নয়। বিশেষত একজন প্রাপ্তবয়স্ক সিঙ্গেল নারীর জন্য এই পথের প্রতিটি ধাপে থাকে নিজের সঙ্গে লড়াই, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির চাপ এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা অদৃশ্য ক্ষত। একজন নারী যখন চাকরি পেয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেন, তখনও সমাজের একাংশ তাঁকে সম্মানের চোখে দেখতে শেখেনি। তাঁর যোগ্যতার চেয়ে বৈবাহিক অবস্থাই যেন হয়ে ওঠে তাঁকে মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।
আমাদের সমাজে ত্রিশোর্ধ্ব বা চল্লিশোর্ধ্ব একজন সিঙ্গেল পুরুষকে প্রায়ই আকর্ষণীয়, প্রতিষ্ঠিত ও স্বাধীনচেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ সমবয়সী, সমযোগ্যতাসম্পন্ন একজন নারীকে কখনো পরিবারের বোঝা, কখনো করুণার পাত্র, আবার কখনো অস্বস্তিকর প্রশ্নের লক্ষ্য হতে হয়। কেন বিয়ে করেননি, কে তাঁকে বিয়ে করবে, একা কীভাবে জীবন কাটবে—এমন প্রশ্নের আড়ালে যে মানসিক চাপ ও অসম্মান লুকিয়ে থাকে, তা নিয়ে সমাজ খুব কমই ভাবে।
কর্মক্ষেত্রেও সিঙ্গেল নারীদের নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কিছু পুরুষ তাঁদের অবিবাহিত থাকার কারণে সহজলভ্য মনে করে অনৈতিক প্রস্তাব দেন। কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের নামে আবেগের সুযোগ নেওয়া হয়, আর্থিক সুবিধা আদায় করা হয়। ভবিষ্যতের মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে একসময় দূরে সরে যাওয়া হয়। নারী সহকর্মীদের কাছ থেকেও কেউ কেউ বিদ্রূপ, হেয়প্রতিপন্ন করা কিংবা পেশাগত অসহযোগিতার শিকার হন। অবশ্য এসব আচরণ সব পুরুষ বা নারী সহকর্মীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; সমস্যা ব্যক্তির অনৈতিক আচরণে এবং সেই আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া সংস্কৃতিতে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু মানুষের চিন্তায় মানবিকতা ও সমতার বিকাশ নিশ্চিত করতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতার কথা বললেও ব্যক্তিগত জীবনের স্বাধীনতা, বিশেষত নারীর বৈবাহিক অবস্থাকে ঘিরে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণা এখনো প্রবল।
একজন মানুষ নানা কারণে সিঙ্গেল থাকতে পারেন। ব্যক্তিগত পছন্দ, উপযুক্ত সঙ্গীর অভাব, পারিবারিক দায়িত্ব, পূর্ববর্তী সম্পর্কের অভিজ্ঞতা কিংবা জীবনের অন্য কোনো বাস্তবতা—প্রতিটি মানুষের গল্প আলাদা। তাই কাউকে প্রকাশ্যে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করা, উপহাস করা কিংবা অপমান করা কোনোভাবেই শোভন আচরণ নয়। একজন নারীর জীবনকে বিয়ের সাফল্য বা ব্যর্থতার মাপকাঠিতে বিচার করার অধিকার কারও নেই।
মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার প্রথম শর্ত হলো নিজের প্রতি সম্মানবোধ অটুট রাখা। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও মেডিটেশন মানসিক প্রশান্তি ও সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি নিজের পছন্দের সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা, নতুন দক্ষতা অর্জন, ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ করা জরুরি। আত্মবিশ্বাস ও যোগাযোগদক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ নেওয়া যেতে পারে। নিউরো-লিঙ্গুইস্টিক প্রোগ্রামিং (এনএলপি) প্রশিক্ষণও কেউ কেউ ব্যক্তিগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে এটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নয়। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা মানসিক বিপর্যয় দেখা দিলে মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিঙ্গেল মানেই কোনো নারী খারাপ, ব্যর্থ কিংবা অসম্পূর্ণ নন। তাঁরও স্বপ্ন আছে, শ্রম আছে, ভালোবাসার ক্ষমতা আছে, আছে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার। মানুষের সাফল্য আসে পরিশ্রম, অধ্যবসায়, দক্ষতা ও সময়ের সমন্বয়ে; বৈবাহিক পরিচয় দিয়ে তার মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সবকিছু সহজ নয়। তবু কঠিন বলে কাউকে দমিয়ে রাখা যায় না। একজন নারীকে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের জন্য নয়, মানুষ হিসেবে তাঁর মর্যাদা, যোগ্যতা ও অবদানের জন্য মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—
প্রশ্নের নামে অপমান নয়, সহানুভূতি।
নিয়ন্ত্রণ নয়, সম্মান।
সামাজিক চাপ নয়, স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ।
লেখক: গবেষক, সংগঠক