সিন্ধুতাই সাপকাল: যে নারী নিজের প্রাক্তন স্বামীকেই নিয়েছিলেন দত্তক

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬

সিন্ধুতাই সাপকাল: যে নারী নিজের প্রাক্তন স্বামীকেই নিয়েছিলেন দত্তক

ভারতের মহারাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক ছোট্ট মেয়ের নাম ছিল সিন্ধুতাই সাপকাল। জন্মের সময় পরিবারে আনন্দের চেয়ে হতাশাই ছিল বেশি। কারণ, তিনি ছিলেন কন্যাসন্তান। দারিদ্র্য, অবহেলা আর সামাজিক কুসংস্কারের মধ্যেই শুরু হয়েছিল তাঁর জীবন।


কিন্তু ছোট্ট সিন্ধুতাইয়ের ছিল এক অন্য রকম স্বপ্ন—তিনি পড়তে চাইতেন। শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর অদম্য ভালোবাসা। সংসারের অভাব আর সমাজের বাধা তাঁকে থামাতে পারেনি। বাবার নীরব সমর্থনে তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে স্কুলে যেতেন। কিন্তু এতটাই দারিদ্র্য ছিল যে একটি স্লেট কেনার সামর্থ্যও পরিবারের ছিল না। তাই তিনি গাছের বড় বড় পাতাকেই নিজের খাতা বানিয়েছিলেন। সেই পাতায় লিখে, মুছে, আবার লিখে তিনি শেখার আনন্দ খুঁজে নিতেন।


কিন্তু সেই স্বপ্ন বেশিদিন টেকেনি। মাত্র ১১ বা ১২ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয় প্রায় ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে।


শৈশব শেষ হওয়ার আগেই তাঁর কাঁধে এসে পড়ে সংসারের ভার। বই-খাতা ছেড়ে হাতে তুলে নিতে হয় রান্নার হাঁড়ি আর সংসারের দায়িত্ব।


গোয়ালঘরে এক মায়ের সন্তান জন্ম দেওয়ার অবিশ্বাস্য কাহিনি


সিন্ধুতাই সাপকালের জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়গুলোর একটি হলো তাঁর কন্যাসন্তানের জন্ম। অল্প বয়সে বিয়ের পর দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্বামীর নির্যাতনের শিকার হন।


একসময় একটি মিথ্যা অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাঁর স্বামী তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করেন। একপর্যায়ে নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিন্ধুতাইকে পেটে লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেন।


আশ্রয়হীন, ক্ষুধার্ত ও অসহায় সিন্ধুতাই গ্রামের একটি গোয়ালঘরে (গরুর আস্তাবল) গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানেই তাঁর প্রসববেদনা শুরু হয়। পাশে ছিল না কোনো চিকিৎসক, ধাত্রী কিংবা আপনজন।


চারদিকে শুধু অন্ধকার আর নিঃসঙ্গতা


অমানুষিক যন্ত্রণা সহ্য করে তিনি একাই একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। সন্তান জন্মের পর নাভির নাড়ি কাটার জন্যও কোনো যন্ত্র ছিল না।


বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বাধ্য হয়ে একটি ধারালো পাথর ব্যবহার করে তিনি নিজেই নবজাতকের নাড়ি কেটে দেন। একজন মায়ের জীবনে এর চেয়ে কঠিন মুহূর্ত হয়তো কল্পনাও করা যায় না।


তবু তিনি হার মানেননি। সদ্যোজাত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে তিনি আবারও জীবনের সঙ্গে লড়াই শুরু করেন। প্রথমে ভিক্ষা করে নিজের ও সন্তানের জীবনধারণের ব্যবস্থা করেন।


পরে নিজের শিশুকন্যাকে নিরাপদে বড় করে তোলার জন্য একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কাছে রেখে দেন, যাতে তিনি পথে-ঘাটে ঘুরে অন্য অনাথ ও পরিত্যক্ত শিশুদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হাজারো অনাথ শিশুর ‘মা’ হয়ে ওঠেন।


কেন নিজের প্রাক্তন স্বামীকেই দত্তক নিয়েছিলেন সিন্ধুতাই সাপকাল?


সিন্ধুতাই সাপকালের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো, তিনি একসময় নিজের প্রাক্তন স্বামীকে প্রতীকীভাবে ‘দত্তক ছেলে’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।


শুনতে অবাক লাগলেও এর পেছনে ছিল গভীর মানবিক ও প্রতীকী বার্তা


স্বামীর নির্যাতন, অপমান এবং গর্ভবতী অবস্থায় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর সিন্ধুতাই নিজের জীবন নতুন করে গড়ে তোলেন। বছরের পর বছর সংগ্রাম করে তিনি হাজারো অনাথ শিশুর ‘মা’ হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে, বার্ধক্যে পৌঁছে তাঁর সেই স্বামী অসহায় ও নিঃস্ব হয়ে পড়েন।


একদিন সেই মানুষটিই ফিরে আসেন সিন্ধুতাইয়ের কাছে। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি তা করেননি। বরং তাঁকে আশ্রয় দেন—তবে স্বামী হিসেবে নয়।


সিন্ধুতাই বলেছিলেন, ‘আমি তো হাজারো সন্তানের মা। তাই তুমি যদি আমার সঙ্গে থাকতে চাও, তবে আমার ছেলে হয়েই থাকবে।’


এরপর তিনি প্রকাশ্যে তাঁকে নিজের দত্তক ছেলে বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এটি কোনো আইনি দত্তক গ্রহণ ছিল না; বরং ছিল ক্ষমা, মানবতা ও আত্মমর্যাদার এক প্রতীকী ঘোষণা।


এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি যেন সমাজকে একটি বার্তাই দিয়েছিলেন—ক্ষমা মানে অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়; বরং নিজের মর্যাদা অটুট রেখে মানবিকতার সর্বোচ্চ পরিচয় দেওয়া।


সিন্ধুতাই সাপকালের এই সিদ্ধান্ত আজও বহু মানুষের কাছে বিস্ময়কর, আবার অনেকের কাছে ক্ষমাশীলতা ও মানবতার এক অনন্য উদাহরণ।


সফলতার গল্প

মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ‘অনাথদের মা’ (Mother of Orphans) নামে ডাকতে শুরু করে। তিনি একাধিক অনাথ আশ্রম ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর অসামান্য মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা তাঁকে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত করে।

তাঁর জীবন নিয়ে নির্মিত হয়েছে তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র, যা কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।


সিন্ধুতাই সাপকালের জীবন থেকে শিক্ষা

সিন্ধুতাই সাপকালের জীবন আমাদের শেখায়, নিজের কষ্টকে যদি অন্যের সুখের কারণ বানানো যায়, সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। দারিদ্র্য, অপমান ও নির্যাতন তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং তিনি সেই যন্ত্রণাকেই শক্তিতে পরিণত করে হাজারো অনাথ শিশুর জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছেন।


তথ্যসূত্র: Mee Sindhutai Sapkal (২০১০)। সিন্ধুতাই সাপকালের বাস্তব জীবনের ওপর নির্মিত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মারাঠি জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র। এতে তাঁর শৈশব, অল্প বয়সে বিয়ে, নির্যাতন, গোয়ালঘরে সন্তান প্রসব এবং অনাথ শিশুদের মা হয়ে ওঠার ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।


*ইশরাত জাহান ইনা


ঢাকা/আরএস

sidebar ad