প্রয়োজনে না বলুন

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬

প্রয়োজনে না বলুন

মানুষ সামাজক জীব। জীবনের পথ পাড়ি দিতে তাকে মিলেমিশে একসাথেই থাকতে হয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় অন্যকে খুশি করতে যেয়ে অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো সবার সাথে একমত হতে হয়। প্রতিটা হ্যাঁ যদি আপনাকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়, তাহলে কোথাও না কোথাও একটি না বলাও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সবসময় হ্যাঁ নয়, না বলতেও শিখুন। 


কর্মব্যস্তময় জীবনে সারাদিনের কাজের পর শরীর ক্লান্ত, মন চাইছে বিশ্রামের। ঠিক তখনই ফোন এলো একটা ছোট্ট কাজ করে দেয়ার অনুরোধ নিয়ে। আপনি জানেন আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন। কিন্তু তবুও মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ঠিক আছে। চেনা লাগছে সিনোরিও টা?  বাস্তব জীবনে এই ধরনের ঘটনার মুখোমুখী হয়নি, এমন ব্যক্তির দেখা কদাচিৎ মেলে। আমাদের অনেকেই অন্যকে কষ্ট দিতে চাইনা, কাউকে হতাশ করতে চাইনা। তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও বারবার হ্যাঁ বলি।  পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজনের তাড়নায় মাঝে মাঝে এমন কাজ করা গেলেও, প্রতিবার অন্যকে খুশি করতে গিয়ে আমরা কি একটু একটু করে নিজের প্রয়োজন, শান্তি আর মানসিক স্বস্তিকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিনা? 

না- ছোট একটি সহজ শব্দ। কিন্তু কেন কখনও কখনও না বলাও এত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়? অনেকের কাছেই এই না বলা অপরাধবোধ মনে হয়। হয়তো আপনি কাউকে হতাশ করতে ভয় পাচ্ছেন। নতুবা উর্দ্ধতন কাউকে প্রত্যাখান করতে উদ্বিগ্ন বোধ করছেন। কারণ যাই হোক, প্রয়োজনে না বলতে শেখা কোন অভদ্রতা নয়, সম্পর্ক নষ্ট করারও নাম নয়। বরং এটা নিজের সীমাবদ্ধতা, সময় এবং মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেয়ার এক সাহসী পদক্ষেপ। 


কেন না বলা কঠিন

সাধারণত এই না বলার অক্ষমতা শৈশব থেকেই আসে। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের ভদ্রতা শেখানো হয়। যদি একজন অভিভাবক বা শিক্ষক একটি শিশুকে কিছু করতে বলেন, তাহলে না বলাকে অভদ্রতার রুপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে, একজন প্রাপ্তবয়স্ককে প্রত্যাখ্যান করার অর্থ শাস্তি বা নেতিবাচক স্বরুপ। 

আবার না বলাটা কঠিন মনে হতে পারার আরেকটি কারণ হতে পারে, আপনার যদি নিজের ব্যাপারে কনফিডেন্স না থাকে। নিজে যে ভূমিকায় আছি তা করার জন্য আত্মবিশ্বাস না থাকে তবে এই ধরনের এটিচুয়েড প্রকাশ পায়। এই অনুভুতির কারণে, অন্যদের না বলাটা এড়িয়ে যাওয়া হয়। ভয় হবে যে তারা মনে করবে আপনি আপনার ভূমিকা এবং দায়িত্ব পালনে অক্ষম।  এছাড়াও, সবচেয়ে সম্ভাব্য যে কারণ রয়েছে এর পিছনে তা হলো বিবেচনা করার মত সহানুভূতি এবং মানব প্রকৃতি। আর এজন্যই আমাদের মধ্যে অন্যদের হতাশ করতে বা সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার ভয় কাজ করে। 


কখন না বলা উচিৎ

না বলাটা যদি আপনার জন্য কষ্টকর হয়ে থাকে, ব্যক্তিগত এই অস্বস্তিকর লক্ষণগুলো সনাক্ত করা জেনে নিতে হবে, তবেই বুঝবেন কখন নিজের ভালোর জন্য না বলতে হবে-


অস্বস্তিকর অনুভূতি হলে

আপনার লিমিট আপনার চেয়ে ভালো কেউ জানেনা। যদি এমন কিছু করতে বলা হয় যাতে আপনি অস্বস্তিবোধ করেন, তবে এটা সাইন হতে পারে যে, আপনাকে না বলতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু মুহূর্তের জন্য লম্বা শ্বাস নিন এবং নিজের মনের কথা শুনুন। 


অপরাধী বা বাধ্য বোধ করা

কর্মক্ষেত্রে কিছু কিছু ক্ষেত্রে না বলাটা আসলেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। চাকরীর জন্য বাধ্য করতে হতে পারে যখন উর্দ্ধতনরা কাজ অর্পন করেন। কিন্তু সবসময় এর মানে এই নয় যে, নিজের সময় এবং শক্তি তাদের চেয়ে কম মূল্যবান। এজন্য নিজ সিদ্ধান্ত অপরাধবোধ বা বাধ্যবাধকতার উপর ভিত্তি করে করা উচিৎ নয়। 


ওভারলোড হয়ে থাকলে

আপনি যদি কাজে ওভারলোড হয়ে থাকেন তবে আরও কাজ বা প্রজেক্টকে না বলুন। নতুন কিছু গ্রহণ করার আগে কিছু সময় এবং শক্তি খালি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। প্রতিদিন যদি দীর্ঘসময় পর্যন্ত কাজ করে থাকেন তবে উইকেন্ডে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। না হয় সেসময় পরিবার এবং কাজ উভয়েরই চাপ পড়বে। মনে রাখবেন, নিজেকে না বলাটা অন্যদের না বলার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের উপর চাপ দেয়া কেবল স্ট্রেস এবং উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। 


অনুরোধ যদি ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে

যখন এমন কিছু করতে বলা হয় যা আপনার সীমানা অতিক্রম করে । তখন প্রক্রিয়াটিকে তার ট্র্যাকে থামানো এবং না বলা গুরুত্বপূর্ন। 


শুধুমাত্র অন্যকে খুশি করার জন্য হ্যাঁ বললে

অন্যদের খুশি করা কাজ সম্পাদনের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রনোদনা হলেও, এটি আপনার কঠোর পরিশ্রমের একমাত্র কারন হওয়া উচিৎ নয়। যদি অন্য কাউকে খুশি করা নিজের সুখ এবং মঙ্গলের মূল্যে আসে তবে এটি  প্রকৃত অর্থে মূল্যবান নয়। 


কীভাবে না বলবেন

* ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা না বাড়িয়ে বিনয়ের সাথে সরাসরি বলুন

* কেন রাখতে পারছেন না তা অতিরিক্ত ব্যাখ্যা তে না যেয়ে সংক্ষেপে বলুন

* অপরাধবোধে না ভুগে নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিন

* যদি সম্ভব হয়, সরাসরি না বলে, বিকল্প উপায় জানা থাকলে সেটার প্রস্তাব দিন


অন্যকে সাহায্য করা, মিলেমিশে চলা অনেক ভালো গুণ। কিন্তু ঘর হোক কিংবা কর্মস্থল, কিছু কিছু ক্ষেত্রে না বলতে জানাও একটি দক্ষতা। একটি ছোট্ট না বদলে দিতে পারে আপনার জীবন। সব অনুরোধ মানতে হবে এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। নিজের প্রয়োজনগুলোকে অগ্রাধিকার দিন, এতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়ে যাবেন।

sidebar ad