কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আমাদের জীবনের নানা ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ছবি, ভিডিও, লেখা কিংবা অডিও—কয়েক মুহূর্তেই তৈরি করা যাচ্ছে এমন সব কনটেন্ট, যা আগে বানাতে প্রয়োজন হতো সময়, দক্ষতা ও বড় আয়োজন। কিন্তু প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার অন্য একটি দিকও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। কারও ছবি, কণ্ঠ কিংবা পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট। আর ভিউ, লাইক, শেয়ার কিংবা সামান্য আয়ের আশায় সেসব ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
এই প্রবণতা নিয়েই এবার সরব হয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। ১৫ অক্টোবর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি এবং তা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিনোদন নয়, এটি অপরাধ।
প্রযুক্তি নতুন, সমস্যাটি পুরোনো
এআই হয়তো তুলনামূলক নতুন প্রযুক্তি, কিন্তু অন্যকে অপমান করে আনন্দ পাওয়া কিংবা গুজব ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রবণতা নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই প্রবণতাকে শুধু আরও দ্রুত ও ব্যাপক করে তুলেছে।
আগে একটি গুজব ছড়াতে সময় লাগত। এখন একটি ছবি বা ভিডিওকে এআই দিয়ে এমনভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব, যা প্রথম দেখায় বাস্তব বলে মনে হতে পারে। একজন মানুষকে এমন কোনো কথা বলতে বা এমন কোনো পরিস্থিতিতে দেখানো যেতে পারে, যা আদৌ ঘটেনি। ফলে প্রশ্নটা শুধু প্রযুক্তির নয়; প্রশ্নটা প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর নৈতিকতারও।
এআই দিয়ে কিছু তৈরি করা সম্ভব বলেই সেটি তৈরি করা উচিত—এমন কোনো নিয়ম নেই। বিশেষ করে কোনো মানুষের সম্মান, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা বিপজ্জনক, মেহজাবীনের বক্তব্য সেই জায়গাটিই সামনে এনেছে।
অপমান যখন কনটেন্টের ব্যবসা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অর্থনীতি অনেকটাই ভিউ ও এনগেজমেন্টনির্ভর। একটি ভিডিও যত বেশি দেখা হবে, যত বেশি মানুষ শেয়ার করবে, সেটি তত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। এই বাস্তবতায় কিছু কনটেন্ট নির্মাতা মানুষের কৌতূহল, বিতর্ক কিংবা ব্যক্তিগত জীবনকে কনটেন্টের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন।
মেহজাবীনের প্রশ্নটি তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ—কয়েকটি ভিউ, লাইক, শেয়ার কিংবা কয়েক ডলার আয়ের জন্য অন্য একজন মানুষের অপমানকে কখন থেকে উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা শুরু হলো?
কনটেন্ট তৈরি অনেকের জীবিকা—এই বাস্তবতাকে তিনি অস্বীকার করেননি। কিন্তু জীবিকা অর্জনের অধিকার অন্যের মর্যাদা নষ্ট করার অধিকার হয়ে যেতে পারে না।
শুধু যে বানায়, দায় কি তারই?
মেহজাবীনের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—তিনি শুধু বানোয়াট কনটেন্ট নির্মাতার দিকে আঙুল তোলেননি। প্রশ্ন তুলেছেন সেই অসংখ্য মানুষের ভূমিকা নিয়েও, যারা এসব কনটেন্ট দেখেন, শেয়ার করেন, আলোচনা করেন এবং আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
একটি মিথ্যা ভিডিও তৈরি করলেন একজন। কিন্তু সেটি যদি হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করেন, তাহলে সেটির বিস্তার আর একজনের হাতে থাকে না। প্রত্যেকটি শেয়ার হয়ে ওঠে সেই মিথ্যা তথ্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও দৃশ্যমান করে তোলার একটি ধাপ।
অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘শেয়ার’ করা নিছক একটি বাটনে চাপ দেওয়ার ঘটনা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন।
কোনো কনটেন্ট সত্য কি না, কারও সম্মানহানি হচ্ছে কি না, এটি কারও ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতি করতে পারে কি না—এসব না ভেবে শুধু চমকপ্রদ বলে শেয়ার করা মানে অনিচ্ছায় হলেও ক্ষতিকর প্রচারের অংশ হয়ে যাওয়া।
‘মা-বোন’ নয়, মানুষ হিসেবে সম্মান
মেহজাবীনের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো সম্মানের প্রচলিত ব্যাখ্যাকে প্রশ্ন করা। কারও সঙ্গে অন্যায় হলে প্রায়ই বলা হয়—‘এটা যদি আপনার মা বা বোনের সঙ্গে হতো?’ মেহজাবীন এই যুক্তিরও সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, একজন নারীকে সম্মান করার জন্য তাঁকে নিজের মা, বোন কিংবা পরিবারের কারও সঙ্গে তুলনা করার প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ হিসেবে তাঁর নিজের মর্যাদাই যথেষ্ট।
এই বক্তব্যের সামাজিক গুরুত্ব অনেক। কারণ সম্মান কোনো আত্মীয়তার ওপর নির্ভরশীল বিষয় হওয়া উচিত নয়। নারী, পুরুষ, পরিচিত, অপরিচিত, তারকা কিংবা সাধারণ মানুষ—প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত মর্যাদা রয়েছে। কারও পরিচিতি যত বড়ই হোক, তার ব্যক্তিগত সম্মান নিয়ে খেলবার অধিকার অন্য কারও নেই।
নারী-পুরুষের গণ্ডি পেরিয়ে ডিজিটাল হয়রানি
এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে আলোচনায় নারীদের ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নারীর ছবি বিকৃত করা, আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করা কিংবা মিথ্যা দৃশ্যের সঙ্গে কাউকে জুড়ে দেওয়া—এ ধরনের অপব্যবহার ব্যক্তির সামাজিক ও মানসিক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে মেহজাবীনের বক্তব্যে একটি বিস্তৃত দিকও রয়েছে। তাঁর মতে, ভিউ ও এনগেজমেন্টের প্রতিযোগিতা এখন নারী-পুরুষের নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে নেই। যে কেউ এর শিকার হতে পারেন, আবার সচেতনতার অভাবে যে কেউ এর অংশও হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ ডিজিটাল নিরাপত্তা শুধু কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা লিঙ্গের বিষয় নয়; এটি সবার দায়িত্ব।
বাংলাদেশের বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ক্ষতিকর ভিডিও, ছবি, অডিওভিজ্যুয়ালসহ নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্টের অপব্যবহারকে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষ করে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে এআই-নির্মিত বা সম্পাদিত উপাদান প্রচারের বিষয়ে আইনে বিধান রয়েছে।
সরকারের খসড়া জাতীয় এআই নীতিতেও ডিপফেক, অনলাইন হয়রানি, অপমান, ভুল তথ্য এবং এআই-নির্ভর ক্ষতিকর কনটেন্টের ঝুঁকি আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে কারও পরিচয় বা সাদৃশ্য ব্যবহার করে হয়রানি, হুমকি, চাঁদাবাজি কিংবা মানহানির মতো অপব্যবহারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে আইন থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। কারণ একটি ক্ষতিকর ভিডিও একবার ভাইরাল হয়ে গেলে পরে সেটি মুছে ফেললেও তার কপি বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেয়ার করার আগে একটু থামি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই কোনো ভিডিও দেখে বিস্মিত হই, উত্তেজিত হই কিংবা কৌতূহলী হয়ে সেটি শেয়ার করি। কিন্তু এখন সময় এসেছে একটি অতিরিক্ত প্রশ্ন করার—‘এটি কি সত্য?’