কিছু কবিতা শুধু পড়া হয় না, হৃদয়ে বয়ে বেড়াতে হয়। কিছু পঙ্ক্তি কাগজের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের প্রেম, বিরহ, একাকিত্ব আর যাপিত জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। হেলাল হাফিজের কবিতা তেমনই। তাঁর কবিতার শব্দে যেমন প্রেমের আকুলতা আছে, তেমনি আছে বিচ্ছেদের হাহাকার, অভিমান, দ্রোহ ও নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাস। তাই তাঁর কবিতা বারবার ফিরে আসে মানুষের কাছে—কখনো আবৃত্তিতে, কখনো গানে।
এবার সেই কবিতাই নতুন করে সুরের শরীর পেয়েছে ‘আজব কারখানা’ সিনেমায়। সিনেমাটির আবহ সংগীত পরিচালনা করেছেন শিল্পী লাবিক কামাল গৌরব। হেলাল হাফিজের চারটি লিরিক থেকে তৈরি হয়েছে পাঁচটি গান। এর মধ্যে একটি গানের আবার দুটি আলাদা সংস্করণ—একটি ফোক, অন্যটি রক।
এক সাক্ষাৎকারে গৌরব জানান, হেলাল হাফিজের কবিতা থেকে তৈরি তিনটি রক গান—‘কষ্ট’, ‘তোমাকেই চাই’, ‘কেউ জানে না, আমার কেন এমন হলো’—গেয়েছে ব্যান্ড ভাইকিংস। অন্যদিকে ‘একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতটা কাঙাল’ গানটির দুটি সংস্করণ নিজেই করেছেন গৌরব। ফলে কবির চেনা শব্দগুলো কখনো রকের তীব্রতায়, কখনো লোকগানের আবহে নতুন শ্রুতিমাধুর্য পেয়েছে।
কবিতার ভেতর যে গান ছিল
হেলাল হাফিজের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার সহজাত গীতলতা। তাঁর পঙ্ক্তিতে এমন এক ছন্দ ও আবেগ রয়েছে, যা পাঠকের মনে সহজেই সুরের অনুরণন তৈরি করে। প্রেমে পড়া মানুষ যেমন তাঁর কবিতায় নিজের কথা খুঁজে পেয়েছে, তেমনি বিরহে থাকা মানুষও খুঁজে পেয়েছে নিজের নিঃসঙ্গতার ভাষা।
‘যে জলে আগুন জ্বলে’—এই একটি কাব্যগ্রন্থই হেলাল হাফিজকে বাংলা কবিতায় দিয়েছে অসামান্য পরিচিতি। আশির দশকে প্রকাশিত বইটির কবিতাগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মুখে মুখে। প্রেম, অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা, হতাশা কিংবা নাগরিক জীবনের ক্লান্তি—সবকিছুকে তিনি এমন ভাষায় লিখেছেন, যা একই সঙ্গে সহজ ও গভীর।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় ‘কবিতা একাত্তর’। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র কবিতার পাশাপাশি এতে যুক্ত হয় আরও কিছু কবিতা। এরপর ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। বইয়ের নামটিও যেন তাঁর কবিতার স্বভাবকে ধারণ করে—বেদনার সঙ্গে বসবাস, কিন্তু তাকে প্রকাশ করার নিজস্ব এক মায়াময় ভাষা।
প্রেম ও বিরহের কবি
হেলাল হাফিজের কবিতাকে শুধু প্রেমের কবিতা বললে তাঁর ব্যাপ্তি হয়তো ধরা পড়ে না। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিমানুষের প্রেমের পাশাপাশি রয়েছে সময়, সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের অস্তিত্বের নানা সংকট। তবে প্রেম ও বিরহের অনুভূতিকে তিনি এমন নিবিড়ভাবে স্পর্শ করেছেন যে পাঠকের কাছে তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই অনেক সময় মনে পড়ে যায় সেইসব পঙ্ক্তি, যেখানে নিজের না-বলা কথাগুলোও যেন লেখা আছে।
এই কারণেই তাঁর কবিতা গান হয়ে উঠলে তা কেবল কবিতার সুরারোপ থাকে না; হয়ে ওঠে এক প্রজন্মের অনুভূতিকে নতুন প্রজন্মের কানে পৌঁছে দেওয়ার এক সেতু।
‘আজব কারখানা’র গানগুলো সেই সেতুরই আরেকটি উদাহরণ। হেলাল হাফিজের কবিতাকে রক ও ফোকের ভিন্ন ভিন্ন সংগীতভাষায় উপস্থাপন করার মধ্য দিয়ে তাঁর শব্দকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই কবিতার ভিন্ন সংগীতায়োজনও দেখিয়ে দেয়—একজন কবির শব্দ কতটা বহুমাত্রিক হতে পারে।
শব্দেরও তো জীবন থাকে
একজন কবি চলে যান, কিন্তু তাঁর শব্দ থেকে যায়। পাঠকের স্মৃতিতে, আবৃত্তিকার কণ্ঠে, গায়কের সুরে কিংবা কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতে হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া একটি পঙ্ক্তিতে। হেলাল হাফিজের কবিতার ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর লেখা কেবল বইয়ের পাতায় আটকে নেই। তা মানুষের প্রেমের চিঠিতে, আবৃত্তির মঞ্চে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে, ব্যক্তিগত স্মৃতিতে—বিভিন্নভাবে বেঁচে আছে। এবার সেই শব্দই নতুন করে আশ্রয় নিয়েছে গানে।
৭ অক্টোবর ছিলো কবির জন্মদিন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এর চেয়ে সুন্দর আয়োজন আর কী হতে পারে—তাঁর কবিতাকে আবার মানুষের কণ্ঠে ফিরিয়ে দেওয়া, নতুন সুরে শোনানো। কবির কলম থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর শব্দ থামেনি। হেলাল হাফিজের কবিতা তাই আজও কেবল পড়া হয় না—শোনা যায়, অনুভব করা যায়, আর কখনো কখনো সুর হয়ে হৃদয়ের ভেতর বেজে ওঠে।