বর্ষায় শিশুর যত্ন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬

বর্ষায় শিশুর যত্ন

শায়লা জাহান


ঋতুচক্রের পালাবদলে তীব্র গরমের পর আর্শীবাদ হয়ে বর্ষার আগমন হয়। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা, তারপর টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা। মুহূর্তেই বদলে যায় চারপাশের চেনা দৃশ্য। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, বৃষ্টির ছন্দময় শব্দ আর চারপাশের সবুজে ধুয়ে যাওয়া প্রকৃতি; সবমিলিয়ে বৃষ্টি যেনো প্রকৃতিকে এক নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দেয়। শুধু প্রকৃতিই নয়, বৃষ্টি ছুঁয়ে দিয়ে যায় আমাদের মনও। 


তবে এই মনোমুগ্ধকর ঋতুর সাথে কিছু চ্যালেঞ্জও আসে, বিশেষ করে ছোটদের ক্ষেত্রে। কারণ বর্ষাকালে সর্দি-কাশি, জ্বর, ডায়েরিয়া, মশাবাহিত রোগসহ নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই বৃষ্টির আনন্দে শিশুকে শামিল করুন, তবে নিরাপত্তা ও যত্নের বিষয়টি যেনো কখনোই উপেক্ষিত না হয়। বর্ষাকাল শিশুদের নিরাপদ রাখার জন্য জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন-


উপযুক্ত পোশাক নির্বাচন

শিশুদের জন্য উপযুক্ত পোশাক নির্বাচন করা বর্ষাকালীন অনেক সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। এই সময় আবহাওয়া কিছুটা স্যাঁতস্যাঁতে থাকে। হালকা ও তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় এমন পোশাক সবচেয়ে ভালো। তাই শিশুকে ভারী কাপড় এড়িয়ে আরামদায়ক, নরম এবং সুতি কাপড়ের পোশাক পরান। কোনো কারনে শিশু বৃষ্টিতে ভিজলে বা ঘেমে গেলে দেরি না করে দ্রুত জামাকাপড় বদলে তাকে শুকিয়ে নিন। 


শুকনো রাখার জন্য ভালো মানের রেইনকোট, ছাতা এবং জলরোধী জুতো ব্যবহার করুন। 


 মশার হাত থেকে বাঁচতে এবং রাতে ঠান্ডা পড়লে নরম ফুল হাতা শার্ট এবং লম্বা প্যান্ট বা ট্রাউজার্স বেছে নিন।  


পুষ্টিকর খাবার ও বিশুদ্ধ পানি

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে রাস্তার খাবার প্রায়ই দুষিত হয়ে থাকে। এই সময় শিশুকে বাইরের খোলা বা বাসি খাবার একদমই দিবেন না। ঘরে তৈরি গরম ও পুষ্টিকর খাবারই তার জন্য উপযুক্ত। 


এছাড়াও, আর্দ্র ও স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় সন্তানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি তাকে ফল দিন। সর্দি-কাশি ও ফ্লু প্রতিরোধে তাদের খাদ্যতালিকায় মৌসুমি ফল এবং কমলা ও লেবুর মতো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল রাখুন। 

সুষম খাবারের সাথে শিশুর শরীরে পানির সঠিক মাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বর্ষাকালে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই সবসময় হাতের কাছে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা বা ফিল্টার করা পানি রাখতে হবে। আপনার সন্তান বাইরে যাওয়ার সময় সাথে করে পরিষ্কার পানি নিচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করুন। 


পরিচ্ছন্নতা

বর্ষায় যেহেতু জীবাণু খুব দ্রুত ছড়ায়, তাই এই সময় শিশুর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। গোসল করানো নিয়ে অনেকে দ্বিধায় থাকেন। কুসুম গরম পানিতে প্রতিদিন গোসল করালে শুধুমাত্র যে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া থেকে দূরে থাকবে তা নয়, বরং শিশুকে আরাম ও প্রশান্তিও দেবে। গোসলের পর ভালো করে মুছিয়ে দিন। ভাঁজে ভাঁজে যাতে আর্দ্রতা না থাকে। 


এছাড়াও তাদের ঘন ঘন হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন, বিশেষ করে খাওয়ার আগে। নখ কেটে ছোট করে রাখতে হবে যাতে ময়লা না জমে। 


অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ছত্রাকজনিত সংক্রমণ এবং স্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ঘরের পরিবেশ শুষ্ক রাখা জরুরী। ঘরের পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে স্যাঁতস্যাঁতে ভাব দূর করতে দরজা-জানালা খুলে দিন যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে। এছাড়াও, আর্দ্রতা কমাতে ডিহিউমিডিফায়ার বা এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করুন। জীবাণুনাশক দিয়ে ঘরের বিভিন্ন উপরিভাগ বা আসবাব নিয়মিত মুছুন। 


রোগবালাই প্রতিরোধ


বর্ষা মানেই ডেংগু-ম্যালেরিয়ার মরশুম। মশার বিস্তার রোধ করতে ঘরের কোথাও পানি জমতে দিবেন না। ফুলের টব, এসি বা ফ্রিজের ট্রে নিয়মিত পরিষ্কার করুন।


ম্যালেরিয়া-ডেংগু থেকে বাঁচাতে মশা তাড়ানোর ওষুধ (রিপেলেন্ট) ব্যবহার করুন। শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে তাদের জন্য উপযোগী ও বিষমুক্ত রিপেলেন্ট বেছে নিন। ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন।


মশা ছাড়াও বর্ষায় বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রবও বেড়ে যায়। তাই জানালা ও দরজায় নেট বা জালি ব্যবহার করুন এবং পোকামাকড় যাতে ভেতরে না ঢুকতে পারে সেজন্য দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করুন। 

 

প্রাথমিক চিকিৎসার প্রস্তুতি


 ঘরে সবসময় কিছু জরুরি ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল সিরাপ, স্যালাইন, কাশির সিরাপ, থার্মোমিটার হাতের কাছে রাখুন।


নিয়মিত টিকার তালিকা মিলিয়ে নিন। বর্ষার আগে নিউমোনিয়া, টাইফয়েড টিকা দেয় থাকলে ভালো। 


জ্বর বা সর্দি-কাশি হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 


ইনডোর অ্যাক্টিভিটি

শিশুর শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টির দিনে ঘরে আটকে থাকার একঘেয়েমি কাটাতে এবং স্ক্রিন টাইম না বাড়াতে বিভিন্ন ইনডোর অ্যাক্টিভিটির ব্যবস্থা করতে পারেন। ক্রাফটিং, ছবি আঁকা, বোর্ড গেমস, পাজল মেলাতে ব্যস্ত রাখতে পারেন। সকলে মিলে বসে গল্প করার মাধ্যমেও পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হবে। 


শরীর সচল রাখতে যোগব্যায়াম, নাচ বা সাধারণ ব্যায়ামের মতো ঘরের ভেতরের শারীরিক কার্যকলাপে তাদের উৎসাহিত করুন। 


শিশুদের জন্য বর্ষাকাল একটি চমৎকার ও আনন্দদায়ক সময়। তবে কিছুটা সতর্ক ও সচেতন থাকলেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানের নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারেন। বর্ষার সঙ্গী হোক সতর্কতা, নয় অসুস্থতা। 

sidebar ad