চাকরিজীবী নাকি গৃহিণী: চাপ কার বেশি?


ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

নারীর পরিচয় যদি ভিন্ন দুই ক্যানভাসে আঁকা হয়, তবে দেখা যাবে তাতে হয়তো গল্পের বুনন আলাদা হবে, রঙ আলাদা হবে, দায়িত্বও হবে আলাদা। একপাশে রয়েছে অফিসের ব্যস্ত করিডোর, ল্যাপটপ, ফাইল বোঝাই টেবিল, মিটিংয়ের ব্যস্ততা; অন্যদিকে রান্নাঘরের উনুন, এলোমেলো ঘর, সন্তানের ডাক আর শেষ না হওয়া গৃহস্থালির কাজ। দৃশ্যপট আলাদা। কিন্তু নিজ নিজ ক্ষেত্রে করা ত্যাগ, ভালোবাসা আর সংগ্রামের ভাষা একই।


দুজনের জীবনযাপন আলাদা। একজনের গন্তব্য অফিস, অন্যজনের কর্মস্থল নিজের ঘর। কিন্তু দিন ফুরোলে ক্লান্তির জায়গাটাও কি সত্যিই এত আলাদা? হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে, কার জীবন বেশি কঠিন? 


হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাই ভুল। কারন, কর্মজীবী নারী বনাম গৃহিণী; তুলনা নয়, বোঝাপড়ার গল্প।


অফিসের চাপ শেষ হয়, কিন্তু দায়িত্ব শেষ হয় না


ঘর এবং বাহির, দ্বিমুখী দায়িত্বের চাপ সামলাতে হয় কর্মজীবী নারীকে। তার দিন শুরু হয় ভোরের আলো ফোটার আগেই। ঘুম থেকে উঠে সন্তানকে তৈরি করা, নাশতা বানানো, স্বামী-সন্তানের প্রয়োজন মেটানো, ঘরের জরুরি কাজ সামলে অফিসের জন্য বের হওয়া— এ যেন এক নীরব ম্যারাথন।


অফিসে পৌঁছে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। কাজের সময়সীমা, বসের প্রত্যাশা, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় আর নিজের দক্ষতা প্রমাণের নিরন্তর চেষ্টা। সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। 


সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেও বিশ্রাম নেই। অফিস শেষে শুরু হয় আরেক দফা দায়িত্ব।


সন্তানের পড়াশোনা কেমন হলো?


রাতে কী রান্না হবে?


বাজার করতে হবে কি না?


কালকের জন্য কি কি প্রস্তুত করতে হবে? 


-সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন দুই পাটাতনের ওপর দাঁড়ানো এক ভারসাম্যের খেলা। ফলে অনেক কর্মজীবী নারীর কাছে বাড়ি মানেই বিশ্রাম নয়; শুধুমাত্র কর্মস্থল বদলানো।


গৃহিণীর চাপ: অদৃশ্য যুদ্ধ


“তুমি তো সারাদিন বাসাতেই থাকো”-  এই একটি কথা কোন গৃহিণী শুনেনি এমন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ছোট একটি কথা, কিন্তু এর ঝাঁঝটা যে এতো বেশি, যার দরুণ তার সারাদিনের ক্লান্তিটা যেন আরও অদৃশ্য হয়ে যায়।


একজন গৃহকর্মী নারীর দায়িত্বের কোনো নির্দিষ্টতা থাকেনা। সেখানে থাকেনা কোন ছুটি, সাপ্তাহিক বন্ধ, পারিশ্রমিক, কাজ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট কোন সময়। অনেক সময় তো কাজের কোন স্বীকৃতিও মেলে না।কারন, ঘরের কাজ আমরা অনেক সময় 'কাজ' বলে গণ্য করি না, যা একজন গৃহিণীর ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ দেয়।


সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্না, ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, সন্তান সামলানো, বাজারের হিসাব, পরিবারের সবার প্রয়োজনের দিকে নজর রাখা—কাজের তালিকা যেন শেষই হতে চায় না। তিনি চাইলে অসুস্থও হতে পারেন না, কারণ সংসার থেমে থাকবে না। 


সন্তানের আবদার, অসুস্থতা, স্বামীর মনমেজাজ, শ্বশুরবাড়ির প্রত্যাশা; সবকিছুর ভার তাঁর কাঁধে। নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা, পরিচয়—সব যেন সংসারের দায়িত্বের নিচে চাপা পড়ে যায়। এই অদৃশ্য শ্রম আর আবেগের চাপ কখনো কখনো কর্মক্ষেত্রের চাপের চেয়েও ভয়ানক।


সবচেয়ে বড় চাপটা হয়তো ‘মানসিক বোঝা’


দুই ধরনের নারীর ক্ষেত্রেই একটা চাপ প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়; আর তা হল, মানসিক বোঝা। পরিবারের কে কখন কী খাবে, সন্তানের স্কুলের কোন কাজ বাকি, বাসার কোন জিনিস শেষ হয়ে এসেছে, আগামী সপ্তাহে কী কী করতে হবে—এসবের একটা দীর্ঘ তালিকা অনেক নারীর মাথায় সবসময় চলতে থাকে।


এমনকি তিনি কোনো কাজ না করলেও তার মস্তিষ্ক হয়তো কাজ করতেই থাকে।


“এটা করতে হবে…”


“ওটার কথা ভুলে গেলে চলবে না…”


“কাল আবার সকালে উঠতে হবে…”


"সময়ের আগেই এটা শেষ করতে হবে..."


এই অবিরাম চিন্তাও ক্লান্ত করে তোলে।


একজন গৃহিণীকে যেমন শুনতে হয়—“সারাদিন তো ঘরেই থাকো, তোমার আবার কীসের কাজ!”—তেমনি কর্মজীবী নারীও মুক্ত নন এই বিচার থেকে। তাকে কখনো শুনতে হয়, “ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে সন্তানকে অবহেলা করছো”, আবার কখনো “সংসার সামলেও এত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেন?”—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।


অর্থাৎ, নারী ঘরে থাকলেও প্রশ্ন, বাইরে গেলেও প্রশ্ন। একজনকে তার ‘কাজ না করার’ জন্য বিচার করা হয়, অন্যজনকে ‘কাজকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার’ জন্য। যেন সমাজের তৈরি এই দ্বৈত মানদণ্ডে নারীর জন্য কোনো পথই পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়।


তবে সবচেয়ে বড় সত্য হলো, যে নারী নিজের কাজে ভালোবাসা ও স্বীকৃতি পান না, তাঁর কষ্ট বেশি। কর্মজীবী নারী অন্তত নিজের পরিশ্রমের ফল দেখতে পান, বেতন পান, পরিচয় থাকে নিজের। গৃহিণী প্রায়ই সেই স্বীকৃতিটুকুও পান না। 


আবার অনেক গৃহিণী সংসারে এতটাই আনন্দ পান যে সেটাই তাঁর শক্তি; আর অনেক কর্মজীবী নারী অফিস-সংসারের টানাপোড়েনে ভেঙে পড়েন।


অফিসের ডেডলাইন, নাকি সংসারের?

 

কার চাপ বেশি কিংবা কার জীবন বেশি কঠিন— এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অবান্তর। একজন লড়েন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে, অন্যজন নিজের ভেতরের জগৎ সামলান। দুজনের চাপই সমান বাস্তব, সমান গভীর। পার্থক্য শুধু প্রকাশভঙ্গিতে। 


এমন তুলনা আসলে দুই পক্ষের প্রতিই অন্যায়। কারণ নারীর চাপ শুধু কাজের পরিমাণে মাপা যায় না। চাপ তৈরি হয় দায়িত্ব, প্রত্যাশা, সময়ের অভাব, স্বীকৃতির অভাব এবং সবকিছু ঠিক রাখার মানসিক চাপ থেকে। তাই কর্মজীবী হোন কিংবা গৃহিণী, প্রতিটি নারীই এক একজন নীরব যোদ্ধা। 

sidebar ad