“ক্ষুধায় যেন আমাদের কেউ মারা না যায়, তাই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।”— কথাগুলো বলতে গিয়ে থেমে গিয়েছিলেন ৪৬ বছর বয়সী মালিকা। কাবুলের অন্যতম দরিদ্র এলাকা চিহিল দুখতারানে স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন। দারিদ্র্য যখন পরিবারটিকে চরম সংকটে ঠেলে দেয়, তখন সবচেয়ে বড় মেয়েকে—কিশোরী বয়সেই—বিয়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন মালিকা ও তার স্বামী। এর বিনিময়ে তারা পান ২ লাখ আফগানি, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার সমপরিমাণ।
মালিকা জানান, সেই শীতকালে তাদের খাবার বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। দিন কাটতো শুকনো রুটি আর পানি খেয়ে। অনেক দিন সেটুকুও জুটত না। ক্ষুধা, ঠান্ডা ও দারিদ্র্যের মধ্যে মেয়েটিও বুঝেছিল, বিয়েতে রাজি না হলে পরিবারের সবাই হয়তো অনাহারে মারা যাবে।
কিন্তু বিয়ের প্রায় দুই বছর পরও সংকট কাটেনি। মালিকার ১২ ও ৯ বছর বয়সী দুই মেয়ে এখন আর স্কুলে যেতে পারে না। তারা ১৬ বছর বয়সী বড় বোনের সঙ্গে পোশাক কারখানায় কাজ করে সামান্য আয় করে। পরিবারের একমাত্র পুরুষ উপার্জনকারী মালিকার স্বামী ঠেলাগাড়ি চালান। তবে প্রায়ই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। বড় মেয়ের বিয়ের সময় পাওয়া অর্থও প্রায় শেষ। ফলে পরিবারটির সামনে এখন অবশিষ্ট একমাত্র সম্পদ—তাদের মেয়েরা।
মানুষের সংকট কমেনি
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পর আফগানিস্তান এক ধরনের নীরব মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আগের মতো গুরুত্ব না পেলেও সাধারণ মানুষের সংকট কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও গভীর হয়েছে।
আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৬ সালে আনুমানিক ২ কোটি ১৯ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ শিশু। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩৫ লাখ শিশু ইতোমধ্যেই তীব্র অপুষ্টির শিকার।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানের অর্থনীতি আগের তুলনায় অনেক ছোট ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্য কমেছে, আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং সরকারি আয়-ব্যয় সংকুচিত হয়েছে। বেকারত্বও ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। পাঁচ লাখের বেশি কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৩.৬ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ৭.৬ শতাংশে। খাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে দরিদ্র পরিবারগুলো।
নারীরা থেকে যাচ্ছেন অধিকার থেকে বঞ্চিত
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি আফগান নারীদের ওপর নেমে এসেছে নজিরবিহীন অধিকারহীনতা। ক্ষমতা দখলের পর তালেবান মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ করে দেয় এবং নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাও নিষিদ্ধ করে। কর্মক্ষেত্র ও জনজীবনের বড় অংশ থেকেও নারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে নারীদের পার্ক ও জিমে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশ্যে নারীদের উচ্চস্বরে কথা বলার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
২০২৬ সালে নতুন একটি কঠোর বিবাহ আইন পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সমালোচকদের মতে, আইনটি কার্যত বাল্যবিবাহকে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে এবং নারীদের বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়াও কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে পারিবারিক সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, আফগান নারীদের অধিকার হ্রাস আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দ্রুত ও পরিকল্পিত পশ্চাদপসরণ। এর প্রভাবের চিত্রও স্পষ্ট। তালেবান ক্ষমতায় আসার আগে আফগান নারীদের প্রায় প্রতি ছয়জনে একজন শ্রমবাজারে অংশ নিতেন। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২০ জনে একজনের পর্যায়ে। মাত্র ১৮ শতাংশ ধাত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মরত। নারী সাংবাদিকদের প্রায় ৮০ শতাংশ চাকরি হারিয়েছেন।
জাতিসংঘের হিসাবে, নারী ও মেয়েদের শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান থেকে বাদ দেওয়ার ফলে আফগানিস্তানের অর্থনীতি বছরে অন্তত ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে।
শিক্ষা বন্ধ, বাড়ছে বাল্যবিয়ের আশঙ্কা
দারিদ্র্য ও নারী অধিকার সংকট একে অপরকে আরও তীব্র করছে। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে, পরিবারগুলো খাবার জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে—আর এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার মেয়েদের বিয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক বোঝা কমানোর পথ বেছে নিচ্ছে।
আফগানিস্তানে বর্তমানে বাল্যবিয়ের নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যও পাওয়া কঠিন। দেশটি বাল্যবিয়ের হার সংরক্ষণ করছে না এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি হয়েছে।
ফলে মালিকার পরিবারের গল্পটি শুধু একটি পরিবারের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে দারিদ্র্য মেয়েদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে, আর নীতিগত বিধিনিষেধ তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাধীনতার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।
আফগান নারীদের জন্য সংকট তাই কেবল অধিকার হারানোর নয়; এটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলার সংকট। আর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্নটি থেকে যায়—যে মেয়েদের আজ স্কুলে থাকার কথা, তাদের কতজন আগামীকাল পরিবারের বেঁচে থাকার বিনিময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হবে?
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান, হ্যারিয়েট বারবার, জুহাল আজাদ ও তামান্না তাবান-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে