ভালো মেয়ে হওয়ার চাপঃ কে লিখেছে এই নিয়ম?

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬

ভালো মেয়ে হওয়ার চাপঃ কে লিখেছে এই নিয়ম?

জমকালো পার্টি চলছিলো। চারদিকে আলো,গান আর উৎসবের আমেজ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এ যেন এক সুখী সংসারের গল্প। একজন স্ত্রী, যিনি হাসিমুখে অতিথিদের সামলাচ্ছেন। সমাজের চোখে তিনি একজন আদর্শ নারী, এক কথায় একজন ভালো মেয়ে। হঠাৎ ছন্দপতন! আচমকা স্বামীর এক চড় এসে পড়ে নারীটির গালে। থেমে গেল সময়, থমকে গেলো পরিবেশ। সময় গড়িয়ে যায়। কিন্তু অবাক করা বিষয় সেদিনের সেই ঘটনায় সবাই বিস্মিত হয়েছিলো থাপ্পড়ে নয়, বিস্মিত হয়েছিলো সেই “ভালো মেয়েটির’’ করা প্রতিক্রিয়ায়। এতো সামান্য ব্যাপারে কীনা সংসার ভেঙ্গে দিবে! বলিউড সিনেমা “থাপ্পড়’’ এর কাহিনী আঘাত করেছিলো আমাদের সামাজের তথাকথিত ভালো মেয়ে’র ধারণার উপর। কখনো কি ভেবে দেখেছেন এই ভালো মেয়ে’র সংজ্ঞাটি আসলে কে তৈরি করেছে? কোন গুণাবলীর মানদন্ডে মেপেই বা দেয়া হয় এই তথাকথিত ভালো মেয়ে’র তকমা? 

 

ভালো মেয়ে শব্দটা আমাদের সমাজে এতোটাই প্রচলিত যে, তা হয়ে উঠার জন্য ছোটবেলা থেকেই যেনো এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেয়া হয়। একটি মেয়ের জন্ম হওয়া মাত্রই তার জন্য স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু হয়ে যায়, “হাউ টু বি এ গুড গার্ল?” তোতাপাখির মতো করে বুলি কেটে শেখানো হয় “জোরে হেসো না’’, “বেশি কথা বলো না’’, “মেয়েদের এত জেদ ভালো না’’, “সবার আগে পরিবারের কথা ভাবো’’, “মানিয়ে নাও’’। কিন্তু মজার বিষয় হলো আজ  পর্যন্ত কোন বই বা ডিকশনারিতে এই ভালো মেয়ের সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া গেলোনা। তবুও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই অলিখিত ধারাটিই চলে আসছে। গ্লোবাল পপ আইকন  টেলর সুইফট তাঁর ডকুমেন্টারিতে বলেছেন, ছোটবেলা থেকে তাঁর মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিলো ভালো মেয়েরা কাউকে অস্বস্তিতে ফেলে না, সবসময় হাসিমুখে সব মেনে নেয়। এই ভালো মেয়ে সেজে থাকার যে এক মানসিক চাপ তা তাঁর গানে ও কথার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। 


ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, কোন একক ব্যক্তি এই সংজ্ঞা বানাননি। ভালো মেয়ে তকমাটি মূলত পি্তৃতান্ত্রিক ও সামাজিক রীতিনীতির সমষ্টি। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতে একজন আদর্শ নারীর পোট্রের্ট  আঁকা হতো শান্ত, বাধ্য, সুশীল, কোমল এবং পরিবারের প্রতি উৎসর্গীকৃত হিসেবে। এছাড়াও, ব্যাপারটি অনেকটা চক্রের মতো বংশানুক্রমিকভাবে ও চলে আসছে। যুগ যুগ ধরে মায়েরা তাদের মেয়েদের শেখায় কিভাবে সমাজকে খুশি করতে হবে। কিভাবে চললে সকলের চোখে ভালো হিসেবে চিহ্নিত হবে। মেয়েটি চুপচাপ? সে ভালো মেয়ে। মেয়েটি নিজের চেয়ে পরিবারের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিচ্ছে? আরেহ, সে তো দারুণ মেয়ে! কিন্তু  ভালো হওয়ার এই রেসিং ট্র্যাকে দৌড়াতে যেয়ে সবকিছু মেনে নেয়ার ব্যাপারটা সেই মেয়েটির মনে কতোটা যে দমবন্ধকর অনুভূতির সৃষ্টি করে তার খোঁজই বা কজন রাখছেন?


এখন মনে হতে পারে, তাহলে ভালো হওয়া কি একটি ভালো গুণ নয়? অবশ্যই ভালো। আমাদের বেশিরভাগকেই শেখানো হয় সহানুভূতিশীল হওয়া, পরের উপকারে আসা, উদার হওয়া- নিঃসন্দেহে এগুলো চমৎকার গুণ। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখনই যখন আমাদের আত্মসম্মান অন্যদের খুশি করার উপর নির্ভর হয়ে পড়ে। প্রায়শই নিজেদের মতামত ও মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে অন্যদের বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। নিজেদের সাথে অন্যায় বা দুর্ব্যবহার করা হলে, কিংবা কোন বিষয়ে ভিন্ন মতামত থাকলে মুখ খুলতে সংকোচ বোধ হলে। সমালোচিত হওয়ার ভয়, ভূল হওয়ার ভয়, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। লোকে কি বলবে- এই চিন্তায় আমরা কুঁকড়ে বেঁচে থাকি।  


একটা সময় ছিলো যখন সমাজে নারী-পুরুষের ভূমিকা মোটাদাগে নির্দিষ্ট করা ছিলো। পুরুষ বাইরে কাজ করবে, সকল সিদ্ধান্ত নিবে। আর নারী করবে ঘরকন্নার কাজ। সংসার সামলাবে, বাচ্চা পালবে। সময় বদলেছে। মেয়েরা পড়াশোনা করছে, ঘরের সাথে সাথে বাইরেও সমান তালে কাজ করছে, নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু সেই যে তার কাছে চাওয়া প্রত্যাশার কি কিছু পরিবর্তন এসেছে? চাওয়ার ভাষাটার বদল হয়েছে শুধুমাত্র, চাপটা নয়। ঘরে বলুন কি কর্মক্ষেত্রে, একজন পুরুষ যখন কোন ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করে তখন তা হবে কনফিডেন্স। আর একজন নারী সেই একই কথা বললে তা হয়ে যাবে, “কি তেজ রে বাবা!’’ অথচ সমাজ গঠনে, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নারীরাও পারে ভূমিকা রাখতে। পারে গঠনমূলক মতামত প্রদান করতে। কিন্তু এই ভালো মেয়ে’র ছাঁচে ফেলে তাকে নিখুঁত, ভদ্র ও নিজেকে ভালো প্রমান করার জন্য এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। মানিয়ে নিতে এবং নিজস্ব ধ্যান ধারণা, মূল্যবোধ, আগ্রহ বিসর্জন দিতে বাধ্য করা হয়। 


সময় বদলে গেছে। ২০২৬ সালে এসে সেই পুরাতন ধারণা দিয়ে নারীকে সংজ্ঞায়িত করার ধারা পাল্টেছে। ভালো হওয়ার মানে নিজের প্রয়োজন ভূলে, সব অন্যায় চুপচাপ সহ্য করা নয়। ভালো হওয়া মানে সৎ হওয়া, সহানুভূতিশীল হওয়া, নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে পারা, প্রয়োজনে না বলতে পারা।

sidebar ad