হাসলে সুস্থ থাকার কারণ কী? বিজ্ঞান যা বলছে

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬

হাসলে সুস্থ থাকার কারণ কী? বিজ্ঞান যা বলছে

আমরা সাধারণত মনে করি, মানুষ আনন্দ পেলে হাসে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এর উল্টোটাও সত্য—মানুষ হাসলেও আনন্দ অনুভব করতে শুরু করে। অর্থাৎ হাসি শুধু আবেগের প্রকাশ নয়; এটি আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলা একটি জৈবিক প্রক্রিয়া।


হাসার সময় আমাদের মস্তিষ্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়। এর মধ্যে এন্ডোরফিন শরীরের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। ডোপামিন আনন্দ ও প্রেরণার অনুভূতি বাড়ায়। সেরোটোনিন মানসিক স্থিতি ও প্রশান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। 


ফলে একজন মানুষ হাসার পর নিজেকে অনেক হালকা, স্বস্তিদায়ক এবং ইতিবাচক অনুভব করেন। অন্যদিকে, যখন আমরা দীর্ঘ সময় দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপে থাকি, তখন শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন নামের স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। 


দীর্ঘমেয়াদে এগুলো উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাণখোলা হাসি এই স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে এবং শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।


হাসি হৃদ্‌যন্ত্রের জন্যও উপকারী। হাসার সময় হৃদ্‌স্পন্দন কিছুটা বাড়ে, ফুসফুসে বেশি অক্সিজেন প্রবেশ করে এবং রক্তসঞ্চালন উন্নত হয়। হাসি শেষ হলে শরীর এক ধরনের আরামদায়ক অবস্থায় চলে যায়, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। 


তাই অনেক চিকিৎসক নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি জীবনে হাসি-আনন্দেরও গুরুত্ব দেন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গেও হাসির সম্পর্ক রয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক আবেগ ও হাসি শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে। যদিও হাসি কোনো রোগের ওষুধ নয়, তবে এটি সুস্থ জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদান।


মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও হাসির গুরুত্ব অপরিসীম। হাসি মানুষে মানুষে দূরত্ব কমায়, বিশ্বাস তৈরি করে এবং সামাজিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। একসঙ্গে হাসলে মস্তিষ্কে এমন কিছু স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা পারস্পরিক সংযোগ ও সহযোগিতার অনুভূতি বাড়ায়। তাই পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে হাসিখুশি সময় কাটানো মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।


মজার বিষয় হলো, স্বতঃস্ফূর্ত হাসি সবচেয়ে বেশি উপকারী হলেও, গবেষণায় দেখা গেছে ইচ্ছাকৃতভাবে হাসার চেষ্টাও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মুখের হাসির পেশিগুলো সক্রিয় হলে মস্তিষ্ক অনেক সময় সেটিকে ইতিবাচক আবেগের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করে। তাই কখনো কখনো একটি ছোট্ট হাসিও মন ভালো করার সূচনা হতে পারে।


তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। হাসি মানে জীবনের সব দুঃখ বা সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়। বরং হাসি আমাদের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি সমস্যার বিকল্প নয়, সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার শক্তি জোগায়।


আজকের ব্যস্ত, প্রতিযোগিতামূলক জীবনে আমরা অনেকেই সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে হাসিকে বিলাসিতা মনে করি। অথচ বিজ্ঞান বলছে, হাসি কোনো বিলাসিতা নয়—এটি সুস্থ জীবনের অপরিহার্য অংশ। একটি আন্তরিক হাসি কখনো ওষুধের বিকল্প না হলেও, সুস্থতার পথে এটি এক অনন্য সহযাত্রী।



হয়তো তাই বলা যায়—হাসি শুধু মুখের ভাষা নয়, এটি শরীর, মন ও সম্পর্ককে একসঙ্গে সুস্থ রাখার প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার।


সাবিনা ইয়াসমীন

সম্পাদক ও প্রকাশক, রোদসী

sidebar ad