৫
বৃষ্টি থেমে গেছে। বাক্স হাতে নওরিনের কালো ব্যাগটি দিয়ে বাসটি দ্রুত চলে গেল। ওভারব্রিজের নিচে বাস হাতে পাণ্ডুলিপি বুকের কাছে আঁকড়ে ধরা কাঁধে লাল রঙের ভ্যানিটি ব্যাগ আর ডানহাতে কালো ব্যাগ নিয়ে নওরিন দাঁড়িয়ে আছে অসহায় মূর্তির মতো। আবার সেই দ্রুত চলে যাওয়া অগণন যান। অত্যন্ত চেনা এক জগৎ থেকে নওরিন যেন অচেনা জীবনগুলোর ব্যস্ত প্রবাহে হঠাৎ নেমে এসে খেই হারিয়ে ফেলেছে। বাস-ট্রাকের শব্দগুলো বাতাসে দূরাগত কোনো আভাসের মতো ভেসে ভেসে আসছে। ‘ব্যাগটা আমার হাতে দিন।’
এতক্ষণ ধরে শোনা পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে চমকে বামে তাকাল নওরিন। মুখ থেকে সাথে সাথে ফসকে গেল, ‘আপনি!’
একটা বাস দ্রুত ব্রেক কষল। ব্রেকের শব্দ ঘর্ষণজনিত কম্পন তুলল বাতাসে। পাশে কেউ নেই। অথচ নওরিন যেন স্পষ্টই শুনেছে বাক্যটা। নির্ঝর নামের ভদ্রলোকের মুখ নওরিনের চোখের সামনে ভেসে উঠল। একজন যাত্রী থেকে যিনি বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন, কথার কোনো এক ফাঁকে বলেছিলেন,
মানুষ হলো দ্বৈরথ প্রাণী।
দ্বৈরথ মানে?
দ্বৈরথ হলো প্রতীক। বলতে পারেন স্ববিরোধী দ্বৈত সত্তার একটা প্রতিবিম্ব ।
তার মানে আপনি বলতে চাইছেন মানুষ স্ব-বিরোধী দ্বৈতসত্তার অধিকারি।
হয়তো। এই যে হয়তো বললাম এটাও এক ধরনের দ্বৈতসত্তা। মানে ‘হয়তো না’ আমার ভেতরে আছে। মানুষের সত্তার সাথে সমাজের দ্বন্দ্ব মিলে আমাদের এক মানুষের ভেতরে দুজন বাস করে।
কী রে? কিছু হারিয়েছিস? কিছু ছাড়া পড়েছে? শাম্মার কথায় ঘোর ভাঙল নওরিনের। নওরিন হেসে বলল,
নাহ! না তো।
তাহলে এতক্ষণ ওমন করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
একটা রিকশার প্রয়োজন আসলে। ব্যাগটা বেশ ভারি।
একটা রিকশাকে ইশারা করলেই পারতিস। রাস্তার ওপাশ থেকে তোকে এত ডাকছি শুনতেই পারিস না। কী? ছুিটতে গিয়ে কাউকে মন দিয়ে এসেছিস নাকি?
তুই যে কী শাম্মা! প্যাঁচাল না পেরে ব্যাগটা ধর। রিকশায় দুবান্ধবি রুমের দিকে যেতে যেতে নওরিনই প্রশ্ন করল,
বৃষ্টিভেজা এই বিকালে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কী করছিলি?
হোটেলে খাবার সেরে ভাবছিলাম ঢাকায় চলে যাব।
কেন?
কাল রাতে কী যে ভয় লাগছিল! একা একা রুমে থাকা কি যে ভয়ংকর ব্যাপার।
বাথরুমের গিয়ে শরীরের কাপড় খুলতে গিয়ে গা ছমছম করে উঠল নওরিনের। আদি-অনাদিকাল ধরে সমসত পিপাসু চোখের প্রাচীন শীতল চাহনি যেন ওর চারপাশ ঘিরে আছে। মানুষ প্রাণিগুলো নগ্ন হয় ভৌতিক অথবা প্রাকৃতিক ভয়গুলো না থাকলেই-এমনই বিশ্বাস নওরিনের। আজ যেন ঠিক তার উল্টা ঘটনা ঘটছে। বাথরুমের ঘুলঘুলি-মতো জানালা ছোট্ট গ্লাস দিয়ে আটকানো। নওরিন গ্লাসের সামনে থেকে এক টুকরো পর্দা সরিয়ে দিল। অবিরাম বৃষ্টির ভেতর ভিজতে থাকা আমগাছটা লজ্জাহীন চোখ ভরে দেখছে নওরিনকে। চোখ বন্ধ করে সে। গায়ে কাপড় দেবার প্রয়োজনবোধ সে করছে না। ভেতর থেকে অস্পষ্ট কী এক অনুভবের শব্দমালা হৃদয় ফুটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মা’র মুখ মনে হওয়ামাত্র নওরিন চোখ বন্ধ রেখেই তোয়ালে দিয়ে ঢেকে দেয় বুক পর্যন্ত। নিজ শরীরের সৌন্দর্য দেখার নেশা এমুহূর্তে মোটেও কাজ করছে না। মুখস্ত করা নয়, বার বার পড়া নয় অথচ তেমনই একটা কবিতার শেষ লাইনগুলোর শব্দরা ভেসে ভেসে এসে যেন হৃদতন্ত্রির বীণায় ঝড় তুলছে।
‘যাকে ছেড়ে যেতে হয় অথচ পড়ে থাকে যেখানে শিকড়
নেকড়ে দলের উল্লাস পেরিয়ে তবুও যে পেছনে টানে
একটি রাতের ঘ্রাণ, আঁধারে লুকানো প্রাণের আঁকড়।’
হৃদয়ে এইসব শব্দবীণার আবেশ নিয়েই গোসল সেরে গা মোছে নওরিন।
কাপড় পড়তে গিয়ে বুকের নিকষ কালো তিলকে মায়াভরে সে দেখে। বুকের স্ফীত অংশে ওমন মায়াকাড়া তিল স্রষ্টা ওকে কেন দিয়েছেনÑ ভেবে দুর্বল হাসির রেখাকে স্পষ্ট করে একটু। ঠোঁটের ফাঁকে ম্রিয়মান সে হাসি ভবিষ্যৎকে প্রাণপণে যেন দূরে ঠেলছে।
এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল নওরিন। বারান্দার নির্জন লম্বা লনটায় চেয়ারে শরীর এলিয়ে নির্ঝরের পাণ্ডুলিপি খুলে বসল। পাণ্ডুলিপির কোথাও লেখকের নাম নেই।
শাম্মা এসে চুপ করে ওর পাশে এসে বসল। মগ্ন নওরিন শাম্মার উপস্থিতি টেরও পেল না।
তুই এখনো এখানে বসে কী পড়ছিস? খেয়েছিস? শাম্মার কথায় ঘোর কাটে নওরিনের। কিন্তু শাম্মার দিকে তাকাতেই ঝাপসা দৃষ্টির সামনে এক অচেনা নারীকে দেখে যেন। শাম্মার চারপাশে অসংখ্য জোনাকীর আলোজ্বলা পুচ্ছ আর সরিষাফুলের ঝিকিমিকি রঙ।
কী হলো নওরিন। ওমন শূন্য দৃষ্টিতে কী দেখছিস?
কয়টা বাজে শাম্মা? অদ্ভুত শোনাল নওরিনের কণ্ঠ। শাম্মা দোতলার লনের দেওয়ালের চওড়া পৃষ্টদেশে বসে নওরিনের কাঁধে হাত রেখে বলল
তোকে এত সুন্দর আর মায়াবী লাগছে। আমিই প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। অসাধারণ কিছু পড়ছিস মনে হয়? প্রেমিকের হাজার দিন ধরে লেখা পত্র নাকি?
জানিস শাম্মা, একটা পাণ্ডুলিপির ভেতর ডুবে গেছি। কী বিভোরতা... বইটা যদি কোনোদিন শেষ না হতো! আমি বইটা শেষ করার জন্য মরিয়া অথচ ব্যাপারটা যদি এমন হতো, আমি পড়ছি আর বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
তুই এত বই-পাগল? জানতাম না তো।
এই উপন্যাসটা আমাকে কেমন যেন করে ফেলছে। কী আশ্চর্য! আমার শুধু মনে হচ্ছে এই ভাষা আমি তারই মুখে শুনেছি।
পাণ্ডুলিপির দিকে একবার তাকাল নওরিন। সন্ধ্যার ছায়া-ছায়ায় প্রিয়জন ফিরে এলে অপেক্ষারত প্রিয়া যেভাবে তাকায়। কত আপন আর কত চেনা যেন। ধীরে উঠল নওরিন।
সারাদিন না খেয়ে বই পড়লে শরীরের ইলেকট্রোলাইট তো আর থাকে না। তাড়াতাড়ি বইটা রেখে আয়। বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসি। দুবান্ধবি একবারে রাতের খাবার শেষ করে রাত নটায় রুমে ফিরল। বিকেলের চা খেয়ে ওরা হাঁটল নিরিবিলি রাস্তাগুলো ধরে। শাম্মার মনে হলো এক মিষ্টি বোবা মেয়ে ওর সাথে সারা বিকেল ঘুরল। মাঝে সে একবার বলল,
কিন্তুপাণ্ডুলিপিটা আমি কীভাবে ফেরৎ দেবো?
কার পাণ্ডুলিপি ওটা? আচ্ছা বলতো নওরিন, ঘটনাটা কী?
নাহ্। কোনো ঘটনা নেই। আমার পাশের যাত্রী এক ভদ্রলোক ওটা পড়তে দিয়েছেন। আমরা কেউ কারো ফোন নাম্বার অথবা ঠিকানা জানি না।
ভুলে গিয়েছেন মনে হয় ভদ্রলোক। তোর কিছু করার ছিল না। মেয়ে হয়ে তো আর ফোন নাম্বার চাইতে পারিস না।
কিন্তু...পাণ্ডুলিপিটা তাকে ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন ।
তার অত প্রয়োজন থাকলে তোর কাছ থেকে ঠিকানা নিত না, তাই মনে করিস?
নাহ্। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তার কাছে পাণ্ডুলিপির হার্ড অথবা সফট কপি নেই। অথচ উপন্যাসটা তিনি এনেছেন ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য। এমন ভুলো মানুষ!
মহামূল্যবান সম্পত্তি হলে তিনি ডিপার্টমেন্টের সব ছাত্রীকে মাঠে জড়ো করার ব্যবস্থা করবেন। ভাবিস না। আমার তো অন্যকিছু মনে হচ্ছে।
কী মনে হচ্ছে?
যেন তুই-ই ভদ্রলোকের ফোন নাম্বার আর ঠিকানার জন্য নিজেই একটু উতলা।
হ্যাঁ, এটা ঠিক। কারণ হচ্ছে...
কী কারণ; থামলি কেন? বল।
জানি না। আমি উপন্যাসের লেখকের ব্যাপারে জানতে চাই! এবং তা খুব জরুরি।
কেন?
আছে; কারণ আছে। আমার কিছু প্রশ্ন ছিল। অবশ্য তিনি আমার মতো তুচ্ছ এক মেয়ের সাথে যদি কথা বলতে চান।
তোর মতো নারীর মন পাওয়ার ব্যাপার আছে বলেই তিনি আনমনে আকাশে বিচরণ করার অনুপ্রেরণা পান। কথা বলবে না মানে? তার কষ্ট বরং তোর ভালোলাগায় সার্থক হবে।
৬
অফিস শেষ করে বাসায় এসে গোসল সেরে খাবার টেবিলে বসে নির্ঝর। রসুল চাচা এরই মধ্যে খাবার সাজিয়ে টেবিলের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বলে,
বাজান, কই কী এবার বাড়িতে পরীর মতো একটা বউ আনলে ভালো হয়।
আর সে যদি পেত্নী হয়?
এত সুন্দর মানুষের বউ কি পেত্মী হয়?
পরীর মতো হোক আর পেত্মী হোক, এসে বউ প্রথমেই আপনাকে এ বাড়ি থেকে বিদায় করতে পারেÑতখন?
পনেরশ স্কয়ার ফিটের এই ফ্লাট বাংলাদেশে এসেই কিনেছে নির্ঝর। লেকের পাশে বলে ফ্লাটটা হঠাৎ পছন্দ হয়েছিল আর যেটুকু সঞ্চয় ছিল তার সাথে আরো কয়েক লাখ লোন করে রিচার্ডের সাথে পরিত্যক্ত কারখানার একখণ্ড জমি কিনেছে সে। বেড়া এবং টিনের ছাদ দিয়ে সেখানে রেখেছে দুজন শিক্ষক। তাদের কাজ স্থানীয় তৃণমূল তিরিশ জন শিশুদের শিক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা করা। ঠিক এই ছোট্ট স্বপ্নকে লালন করার জন্য সাবরিনার সান্নিধ্য ছেড়ে অনেক কাঠখড় পেরিয়ে বাংলাদেশে একটা পোস্টিং পেয়েছিল নির্ঝর। কিন্তু তিন বছর অথবা তার আগেই দেশ থেকে পোস্টিং হয়ে গেলে? নির্ঝর জানে ওর স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়বে। আশেপাশের প্রভাবশালী মানুষগুলো ওর ক্ষুদ্র স্কুল এবং স্বপ্ন পুরোটাই দখল করে ফেলবে। ঢাকায় সেজন্য একজন ভালো বন্ধু ওর প্রয়োজন, ভাবে নির্ঝর। যে নিঃস্বার্থভাবে দরিদ্র-ছাত্রদের জন্য নির্মিত স্কুল এবং আশ্রয়স্থলটি রক্ষা করবে এবং পরিচালনা করবে।
নির্ঝরের সেল ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা নাম্বার দেখে খুশি হলো নির্ঝর। মেয়েরা যে কত রহস্যময়ী; ভাবল সে। নিশ্চয়ই যাত্রাপথে কোনো না কোনোভাবে নওরিন ওর নাম্বারটা যোগাড় করেছে। কিন্তু কখন এবং কীভাবে তা সে ভেবে পেলে না। ভাবতে ভাবতেই কলটা ‘মিসড-কল’ হয়ে গেল। আবার ফোন বাজামাত্র নির্ঝর গলাকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে নওরিনকে বিস্মিত করতে বলেই বসল,
নওরিন! আপনি আমার ফোন নাম্বার পেলেন কোথায় বলুন তো?
ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে পুরুষকণ্ঠে একটা স্মিত হাসি ভেসে এলো। এবং তারপরই কণ্ঠ থেকে অকথ্য ভাষায় অমিয় বাণী ঝরে পড়ল। অনেকক্ষণ ধমকাধমকি করে ফোনের অপর প্রান্ত হতে লোকটি বলল,
বেশি নয়, মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা আপনার চাঁদা। বুঝেছেন স্যার। না হলে কল্যা থেকে ধড় নামায়া দিমু কইলাম।
ফোনের লাইন কেটে গেল। নির্ঝর বাকি খাবারটুকু না খেয়ে হাত ধুয়ে ফেলে। আট মাস পার হতে চলল ঢাকায় অথচ কারো সাথে নির্ঝরের বন্ধুত্ব হলো না। পুরাতন বন্ধুরা এই আসছি, আসব বলে সময় করতে পারল না। এখন বিষয়টা কার সাথে শেয়ার করা যায় ভাবতেই যে কয়টা মুখ ভেসে এলো নওরিন তাদের একজন। আশ্চর্য! একদিনের পরিচয়ে এমন হয়? নওরিনের ডান কানের নীচে হালকা লালচে তিলটা এ মুহূর্তে নির্ঝরের স্মৃতিপটে এক নির্ভরতার প্রতিবিম্ব হয়ে ভেসে উঠছে। মেয়েটা এত গাধা! ভাবল নির্ঝর, আমি পাণ্ডুলিপি দিলাম যেন সে প্রশ্ন করতে পারে, ‘কোন ঠিকানায় এটা ফেরত পাঠাব?’ সে কল্পনা বিস্তৃত করতেই থাকল,
পড়া শেষ হলে আমাকে ফোন করবেন, আমি নিয়ে আসব।
না এসবের কিছুই হলো না। ছেলেমানুষ সরাসরি কি কোনো মেয়ের ফোন নাম্বার চেয়ে তাকে বিব্রত করতে পারে? না করা উচিৎ? অন্তত নির্ঝর এসব পারে না। পানির গ্লাস নিয়ে বারান্দায় লেকের সামনে বসে সে। অসহায় খালটির প্রবাহহীন জলে ঈষৎ কটু গন্ধ ভাসছে। কয়েকদিন বাস করলেই যে গন্ধটার অস্তিত্ব ভিন্ন করে আর স্পষ্ট হয় না। ভাগ্যিস অভিযোজন ব্যাপারটা রপ্ত করতে মানুষ প্রাণিগুলো পারঙ্গম। কোনো একদিন জনশূন্য এই প্রান্তর শুধু ছিপছিপে জলের আস্তানা ছিল। এই লেকের অংশটুকুই হয়ত অপেক্ষাকৃত গভীর জলের অংশ ছিল। দালানহীন, মানুষ বসবাসের অনুপযুক্ত এই ভূমিটুকু কোনো এককালে হ্রদের হৃদয় নিয়ে কথা বলত আকাশের সাথে। মাঝবেলায় রূপকাহিনীর প্রান্তর হয়ে ভেসে থাকত একা একা। সন্ধ্যা অথবা মাঝরাতে ছপছপ পা ফেলে দুএকজন জেলে অথবা মাছ পাগল মানুষ টর্চ অথবা হারিকেনের আলো নিয়ে ঘুরত এখানে সেখানে। তারা ফিসফিস কথা বলত। কোথায় হারিয়ে গেছে সেইসব সরল প্রাণের ফিসফিস-এইসব দিনের জটিল ব্যস্ততম কোলাহলে! লেক-পাশের বারান্দায় ওভাবে সে কতক্ষণ সময় গেল সে টের পেল না। সুন্দর কথার পৃষ্ঠে এত সুন্দর কথার প্রত্যুত্তর করতে পারা নির্ঝর জীবনের সীমাবদ্ধতম দুর্বলতা উপলব্ধি করে নিজের প্রতিই করুণ হাসি ছড়িয়ে দিলো। ফোনে হুমকি দেওয়া লোকটির বাজে কথাগুলো শোনার সময় নির্ঝরের মাথা মোটেই কাজ করছিল না। এসব কথার ভালো উত্তর কী হতো, তা-ও সে ভেবে পেল না। চোখে ঘুম ঘুম আবেশ নিয়ে বারান্দা ছাড়ল সে। পরদিন থানায় একটি জিডি করার কথা ভাবল। খাবার টেবিলে এসে বড় গ্লাসটায় জগ থেকে পানি ঢালল। চেয়ারে বসে দৃষ্টিকে প্রসারিত করে ধীরে তৃপ্তির সাথে পানিটুকু পান করে বেডরুমে ঢুকল। চাঁদের আঁধারি আলোর মতো মৃদু আলোয় বিছানার ফুলতোলা চাদর যেন নববঁধূ হয়ে নির্ঝরকে জড়িয়ে নিল। অতল ঘুমে তলিয়ে গেল সে।
ঘুমে মধুর ইচ্ছাগুলি স্বপ্ন হয়ে প্রতিফলিত হয় মাত্র। ইচ্ছের প্রতিধ্বনির নাম হয়তো স্বপ্ন। নির্ঝর স্বপ্নের কাতর অনুভূতিতে এপাশ ওপাশ করল। সিঁথির মতো বয়ে চলা এক রাস্তা...। ছোট্ট এক শিশু সে রাস্তা ধরে দৌড়াচ্ছে এবং ক্রমশ ছোট এক বিন্দুতে পরিণত হচ্ছে...
ঘুম ভেঙে সে মনে মনে হাসল। নওরিনকে দেখার পর থেকে মাহজাবিন নামের নারীটি স্বপ্নে আর দেখা দিচ্ছে না।
৭
মোহাম্মদ আলী বিদ্যুৎসাহী মানুষ। প্রাসাদে নতুন আগত দুই অতিথিকে সকলের সাথে এমন ভঙ্গিতে পরিচয় করিয়ে দিলেন যেন তারা আজন্ম তার পরিচিত এবং আত্মার সাথে সংশ্লিষ্ট। বৃদ্ধের তথ্যকে ভুল মনে হলেও তার বলা কথার ইংগিতের ভেতরে তিনি এক চরম সত্যকে উপলব্ধ করেছেন। সেই উপলব্ধির অনুভব থেকে প্রাসাদবাসী কূল-নারী, অমাত্য, কর্মচারী ও ভৃত্যগণ সকলের কাছে মাহজাবিন আর নাগিবকে প্রাসাদে বিশেষভাবে গ্রহণের যে গল্প তিনি ফাঁদলেন তা তিনিও মনে প্রাণে ধারণ এবং বিশ্বাস করেই বললেন।
বয়সের ব্যবধান কম হওয়ায় নাগিবকে সহসাই নিজ সন্তানের স্থলে ভাবতে সমস্যা হলেও মাহজাবিনের ক্ষেত্রে ঘটল উল্টা ঘটনা। মোহাম্মদ আলীর মনের আয়নায় মাহজাবিনের স্থির এক প্রতিচ্ছবি যেন তার অস্থিমজ্জা আর মননে যুগ যুগ ধরে প্রোথিত ছিল। মাহজাবিনকে এমন এক আলোবর্তিকা হিসাবে তিনি গড়ার স্বপ্ন দেখলেন, যে এই শহরের অন্ধকারে ডুবে থাকা নারী সমাজের ভেতরে আলো ছড়াবে। বিদ্যাশিক্ষার প্রতি অনুরাগি করে তুলবে শত শত কিশোরী আর তরুণীকে।
কয়েক বছরের মধ্যেই মাহজাবিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে পদার্পণ করবে। কিন্তু প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি এই শহরে কোনো মহাবিদ্যালয় না থাকায় তার অন্তর ব্যথিত হয়ে উঠল। তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন, যে ভূমিতে তার জন্ম, আড়াই হাজার বছর পূর্বে সেই ভূমিতে মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত ছিল। শেষার্ধে ধর্মপাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত সোমপুরের শিক্ষা বিস্তারের আলোকোজ্জ্বল এক চিত্রকল্প তার মানসপটে ভেসে উঠল। তিনি ভাবলেন, তার ধারণা যদি সঠিক হয়ে
থাকে, তাহলে আর্য বলে কোনো জাতির ভিন্ন কোনো অস্তিত্ব নেই। অস্ট্রিক জাতিগোষ্ঠি দিয়ে বিস্তৃত পুণ্ড্র জাতির অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত শ্রেণিই ছিল আর্য।
মহাভারতের দ্বিতীয় পর্বে নিঃসন্তান বলিরাজা এবং রাণী সুদেষ্ণাকে নিয়ে যে গল্প ছড়ানো হয়েছে মোহাম্মদ আলী জানেন তা স্পষ্টত বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয়। মহাভারত তিনি আদ্যপান্ত পড়েছেন। বিশালায়তন এই গ্রন্থের বিজয়পর্বে পঞ্চপান্ডবদের অপ্রতিহত বিজয়ের ইতিহাস আছে। উড়িষ্যা ও কামরূপ পর্যন্ত সমস্ত ভূ-ভাগ ধর্মরাজের করতলগত হলেও পুণ্ড্র রা তাদের প্রতিরোধ করে স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। বস্তুত এক শ্রেণির ভিনদেশী যাযাবর এদেশীয় উচ্চ শ্রেণিদের নিয়ে পুণ্ড্র প্রসাদ দখলের ষড়যন্ত্র করে। নিজেদের আর্য দাবী করে এবং পুণ্ড্র সভ্যতা দখলে ব্যর্থ হয়ে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় বিধান বয়ান করেছেন। খৃস্টপুর্ব ১০০০ থেকে ১৫০০ বছর পূর্বে তাদের বিচিত্র সব পৌরাণিক কাহিনীর সূত্র ধরে বেদ, রামায়ন মহাভারত অথবা পুরাণে অদ্ভুত সব ইতিহাস রয়েছে। মহাভারতের সভাপর্বে পুণ্ড্র দের সুজাতি শ্রেণিসহ এবং শ্রেষ্ঠ জাতি হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। কর্ণপর্বে তাদেরকে শাশ্বত ধর্মজ্ঞ বলা হয়েছে। মহাভারতে ইতিহাস সন্নিবেশকারী এইসব মহারথীগণ শাস্ত্রীয় বিধান হিসাবে পুণ্ড্র বর্ধনের করতোয়ার পূণ্য সলীলে একবার স্নান করলে লক্ষ-কোটি কূল পরিত্রাণ পায় এমন বাক্যও সংযোজন করেছেন। অথচ সেই মহাভারতের শান্তিপর্বে বর্ণিত দস্যুজীবীদের তালিকায় পুণ্ড্র দের নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। মোহাম্মদ আলী অনুভব করলেন, মহান পুণ্ড্র নগরী দখল করতে ব্যর্থ হয়েই পুণ্ড্র দের সম্বন্ধে এমন বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। এমনকি ঐতেরের ব্রাহ্মণে পুণ্ড্র গণকে দস্যু, কুকুর খেকো এবং ম্লেছ বলা হয়েছে। মোহাম্মদ আলী স্পষ্টভাবে অনুভব করেন যে, সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বের যে বাংলা শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে রাজা অশোক মূলত প্রজাবৃন্দকে আকুল হয়ে সাহায্য করতে চেয়েছেন। আকাশের দিকে তিনি উদাস ভঙ্গিতে তাকালেন। নীরব রাতের আকাশে জ্বল-জ্বল জ্বলতে থাকা তারাদের মাঝে রাজা অশোকের ছড়িয়ে রাখা ভাবনার রেশকে আরো তীব্রভাবে অনুভব করতে চাইলেন।
মোহাম্মদ আলী নড়েচড়ে বসলেন,
নাহ্ ভাবালুতা নয়। যে ভূমি বঙ্গদেশের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল এবং যেখানে আড়াই হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মহাবিদ্যালয়, তাঁর মনে হলো সেই ভূমিতে এই মুহূর্তে কোনো মহাবিদ্যালয় নেই এ ব্যর্থতা তাঁর এবং বগুড়াবাসীর। শীঘ্রই একটা কলেজ প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবলেন তিনি এবং কোমর বেঁধে মাঠে নামলেন। তার আগে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি নাগিবকে পাঠিয়ে দিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে।
মাহজাবিন তার সাথে আনা বইগুলি পড়ার টেবিলে সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়েছে। সুপরিসর কামরার পূর্বদিকের জানালা খোলা। এই জানালা দিয়ে কলকল প্রবাহিত করতোয়ার দিকে নিমগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহজাবিন। শীত শীত ভোরের মৃদু কুয়াশার আস্তরণ পেরিয়ে কাঁধে খেজুর রসের ভাড় নিয়ে কেউ একজন আইল পথে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে সাত সকালে কিশোরী মাহজাবিনের চোখ ভিজে উঠল। বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা বিষ পিঁপড়া কামড়ে চলছে। সেই কামড়ের চিনচিন অনুভব আছে; ব্যথা নেই। সবুজ শস্যক্ষেতগুলোর প্রান্ত রেখা জুড়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠা কুয়াশার আস্তরনে একটা মুখাবয়ব সে যেন স্পষ্টই দেখতে পায়। তার মা!
মোহাম্মদ আলী সম্প্রতি মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রত্যাশায় এম এ জিন্নাহ’র আহবানে পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এসময় তিনি ইংরেজ প্রদত্ত উপাধি বর্জনের চিন্তা করলেন। তারপর একদিন সকালে মোহাম্মদ আলী গায়ে শাল জড়িয়ে ধীর পদক্ষেপে ঢুকলেন মাহজাবিনের কামরায়। স্নেহভরে হাত রাখলেন তার মাথায়। মাথা নিচু করে চুপটি করে চোখ মুছল কিশোরী মাহজাবিন। মমতা মাখা চোখ মেলে নওয়াব মা-হীনা মাহজাবিনকে মায়াভরা কণ্ঠে বললেন,
মারে! ঐ যে করতোয়া বিধৌত সবুজ ভূমিকে ছেয়ে আছে নীলাকাশ, এই পবিত্র চরাচরই আমাদের মা!
নিষ্পাপ দুচোখের অক্ষিগোলকে পরম নির্ভরতা মেখে মাহজাবিন তাকাল নওয়াবের চোখে। কালো ভ্রু’র চন্দ্রাকৃতির নিচে মাহজাবিনের একজোড়া গভীর চক্ষুদ্বয়ে নওয়াব স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। প্রথম দিনেই নওয়াব মাহজাবিনের চোখে লুকানো কোনো এক আলোর আভাস পেয়েছিলেন। লুকানো তবু স্পষ্ট নিরীহ অথচ দ্যুতিময় এই দৃষ্টি নওয়াব মোহাম্মদ আলীকে যেন অশ্রুত স্বরে বলিয়েছিল- ‘প্রিন্সেস!’ কিছুদিনের মাঝেই তিনি মাহজাবিনের পুস্তকপ্রীতিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। মাহজাবিন তার পিতার মুখ স্মরণ করতে পারে না। নওয়াবের প্রীত দৃষ্টি, অনন্য আর অসামান্য মহৎ-হৃদয়ের এই মানুষটির ভালোবাসায় তার শুধু মনে হয়- সে তার পিতাকে ফিরে পেয়েছে। এই অনন্য অনুভবের আপ্লুততায় মাহজাবিন নওয়াবের পায়ে হাত রেখে তাকে ছালাম করে বলল,
আমারও তাই মনে হয়, আব্বা-হুজুর।
মা, তোমার স্কুল জীবন শেষ হলে যেন আরো উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারো তার জন্য এই শহরেই কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করছি। এ নিয়ে আজ একটি সভা আহবান করেছি। প্যালেসেই অনুষ্ঠিত হবে সভাটি।
নবাব বস্তুত মাহজাবিনকে উচ্চশিক্ষিত করে কুসংস্কার আর অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং পুরুষ সেবায় প্রাণাতিপাত করা বগুড়ার নারী সমাজকে জাগানোর জন্য কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তব করতে চান। কিন্তু কীভাবে এবং কাদের নিয়ে কাজটা শুরু করা যায়Ñএমন ভাবনায় তিনি যখন মগ্ন তখনই মৌলভী মোঃ ওসমান গণি নামের এক দৃঢ় প্রত্যয়ী মানুষ নবাবের সাক্ষাৎ প্রার্থী হলেন। কাকতালীয়ভাবে এই মানুষটি নবাবকে বগুড়ায় একটা কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তার মনের বাসনা ব্যক্ত করলেন,
নবাব আপনাকে পাশে পেলে বগুড়ায় আমরা একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়ব।
গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষাজীবন গুরু হয়েছিল মৌলভী মোঃ ওসমান গণির। তার কৃষক পিতা চেয়েছিলেন লেখাপড়ার মতো অকর্ম করার চেয়ে ছেলে তার সাথে ক্ষেত খামারে কাজ করুক। কিন্তু বিদ্যা-শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ওসমান গণি মাতামহের প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স শেষ করে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন। সেই সময় উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি বিলেতে যাবার স্কলারশিপ পান। ময়মনসিংহের গফরগাঁয়ে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়ে চাকরি জীবন শুরু করেন। তারপর গফরগাঁয়ের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে সরকারি চাকরি আরম্ভ করেও তাতে ইস্তফা দিয়ে নিজ জেলায় একটা কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ফিরে আসেন। আর তার এই ফিরে আসার কারণ স্কুল জীবন পরীক্ষায় ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনা। এই রচনায় বই-পুস্তকের শেখা ‘লক্ষ্য’ বাদ দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘পেশা হিসাবে শিক্ষকতাকে গ্রহণ করে নিজ জেলায় একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করব।’
ছোট্টবেলায় নিজেকে দেওয়া নিজের কথা রাখার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে সব আয়েশ ফেলে নিজ ভূমিতে তিনি ফিরে এসেছেন। ওসমান গণির মনে হয়েছিল এই কথাটি বাস্তবায়ন করতে না পারলে নিজের কাছে নিজেকে মিথ্যুক পরিচয় দিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে। এর চেয়ে ব্যর্থ জীবন আর কী হতে পারে? তিনি নওয়াবকে আবার বললেন,
ফকির মজনু শাহ আর ওয়াহাবীরা এই এলাকা থেকে ব্রিটিশ তাড়িয়ে পুন্ড্রের স্বাতন্ত্রতা বজায় রাখলেও ধূর্ত ব্রিটিশরা তাদের আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থেই কাজে লাগিয়েছে। মোহাম্মদ আলী আগ্রহী হয়ে ভ্রু-কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,
যেমন?
যেমন সাধারণ মানুষ এই ছড়াটি শুনিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়ায়-
‘কালান্তক যমবেটা কে বলে ফকির
যার ভয়ে রাজা কাঁপে, প্রজা নহে স্থির।
সাহেব সুবার মতো চলন চালন
আগে চলে ঝান্ডাবন ঝাউল নিশান।’
ব্রিটিশরা এই ছড়াটি লিখিয়ে নিয়ে ফকির মজনু শাহ সম্পর্কে অপপ্রচার চালাচ্ছে। যার জন্য মজনু শাহ চুরি করলেন, সেই বঙ্গবাসীই তাকে এখন চোর বলছে।
ব্রিটিশরা তো প্রায় এই এলাকাছাড়া।
মজনু শাহ আর ওয়াহাবীরা মাঝখান থেকে ব্রিটিশদের উপকার আর আমাদের অপকার করলেন।
কীভাবে?
ব্রিটিশরা এই নবাব পরিবারের জমিতে এক রেললাইন বসিয়ে খালাশ। তাও তারা বসিয়েছে নিজেদের বাণিজ্যের সুবিধার জন্য। এই নবাব আর জমিদার পরিবারগুলোর মাধ্যমে তারা খাজনা ঠিকই আদায় করছে, মাঝখান থেকে এই অঞ্চলে কোনো কাজ করছে না। পুণ্ড্র সভ্যতার এই শহরে বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা, একটা কলেজও প্রতিষ্ঠা তারা করে নি। যা কিছু হলো সব কলিকাতা আর দিল্লিতে। নওয়াব বললেন,
তবু মজনু শাহ আর ওয়াহাবীদের জন্য পুন্ড্রের পবিত্র পলিতে ব্রিটিশরা নীলচাষ করাতে পারে নি এ-ও তো কম পাওয়া নয়। কিন্তু গণি সাহেব, আমাদের পক্ষে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যাওয়া কি ঠিক হবে?
তাহলে আপাতত তো কলেজ প্রতিষ্ঠা কাজে আমরা হাত দিতে পারি।
হ্যাঁ, আমরা কলেজ অবশ্যই প্রতিষ্ঠা করব। যাদের কাজে সংশ্লিষ্ট করা যায় তাদের একটা তালিকা তৈরি করুন। এখান থেকে আমরা পিছপা হবো না কিছুতেই।
নবাবে হুজুর, ১৯১০ সালে ধনবাড়ির জমিদার নবাব আলী, ১৯২৬ সালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রায় এ কে মুখার্জি, মহকুমা প্রশাসক এমদাদ আলী কর্ণপুরী, এতদঞ্চলে কলেজ প্রতিষ্ঠায় এদের প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছে আমি তা জেনে নিয়েছি। এবার আমরা ব্যর্থ হবো না।
মৌলভী ওসমান গণির উদ্যোগে কলেজ প্রতিষ্ঠার সেই সভাটি আজ হতে যাচ্ছে এই সংবাদ মাহজাবিনকে জানাতে পেরে নবাব প্রীত বোধ করলেন। কিন্তু পিতা নওয়াব আলতাফ আলী কর্তৃক লিখতে শুরু করা ইতিহাসের অংশটুকু সেই সভা শুরু করার আগেই কেন মাহজাবিনের নিকট হস্তান্তর করতে তাঁর ইচ্ছে করছে তা তাঁর নিজের কাছে বোধগম্য হলো না। তিনি স্বর্ণরঙখচিত বড় একটা কাগজের খাম মাহজাবিনের হাতে হস্তান্তর করলেন। আনমনা স্বরে বললেন,
কাজের ফাঁকে যদি ভুলে যাই, আমার আব্বা হুজুরের লেখা; এটা যত্ন করে তোমার কাছে রেখে দিয়ো। বলে তিনি থামলেন এবং আবার তার স্নিগ্ধ দৃষ্টি প্রসারিত করে বললেন,
আমার পিতামহ থেকে শুরু করে সকল পূর্ব পুরুষগণ কিছু লিখলে ফারসি অথবা আরবি ভাষায় লিখতেন। আব্বা-হুজুর সেই প্রথা ভেঙেছেন- লেখাটা তিনি বাংলায় লিখেছেন। যত্ন করে রেখো।
মোহাম্মদ আলী চলে গেলেন। স্বর্ণরঙখচিত খামটার দিকে কিছুক্ষণ অবাক তাকিয়ে থাকল মাহজাবিন। মোহাম্মদ আলীর চলে যাওয়ার পথপানে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই প্যালেসে এত মানুষ, তাদের কাউকে পিতার স্মৃতি-স্মারক এই স্বর্ণখচিত খামটা না দিয়ে মোহাম্মদ আলী খামটা তাকে দিয়েছেন! বুকের কাছে খামটা আঁকড়ে ধরে মাহজাবিন চোখ বন্ধ করে প্রলম্বিত শ্বাস নিল। যেন নিজেকেই নিজের ভেতর ডুব দিয়ে খুঁজে ফিরল। সবকিছু ছাপিয়ে আজকের এই প্রাপ্তি যেন অনেক বড় মনে হলো তার কাছে। খামটা অবশ্যই সে যতœ করে রাখবে। কিন্তু এর ভেতরে কী লেখা আছে তা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল সে। পানির স্পর্শ দিয়ে আলতো করে খুলে ফেলল খামটা। লেখাটুকু পড়ে তার কিশোরী অনুভব জেগে থাকা শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক অজানা আবেগের স্রোত বয়ে গেল। ‘সংস্কৃত শ্লোকে সম্রাট অশোকের সমাধিস্থলেরও নির্দেশ আছে...’
সেই গ্রন্থ আর শ্লোক খুঁজে বের করার দায়িত্ব মোহাম্মদ আলী তাকে অর্পণ করলেন? মানে তিনি শুধু তাকে এই কাজের যোগ্য উত্তরসূরী মনে করেন? আশ্চর্য! তার মনে পড়ল, আব্দুল বশির এক সন্ধ্যায় তার মাথায় স্নেহমাখা হাত রেখে বলেছিলেন,
এক নিষ্পাপ হৃদয় সহজেই আরেক নিষ্পাপ আত্মাকে সনাক্ত করতে পারে। ভালোবাসাপূর্ণ মন সহজেই আবেগি মানুষের চোখের ভাষায় লুকানো কষ্ট চিহ্নিত করতে পারে। আর একজন প্রতিভাবান মানুষই শুধু আরেকজন নৈসর্গিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষকে চিনতে পারে!
৮
নওরিন
ব্যাপারটা মোটেও ভালো হয়নি। এখন যা হচ্ছে তা আরো খারাপ। আমি আপনার আস্তানাটুকু জানলেও আপনি আমার নাড়ি-নক্ষত্র কিছুই জানেন না। পাণ্ডুলিপিটা ফেরৎ দেবেন কীভাবে? আচ্ছা আপনি অসুস্থ নন তো? সরি, এভাবে প্রশ্ন করাটা ঠিক নয়। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানেন? গত রাতে আমি আশ্চর্যজনক এক স্বপ্ন দেখলাম,
সিঁথির মতো বয়ে চলা এক রাস্তা। সরু রাস্তার দুপাশেই লম্বা লম্বা ঘাস-গাছ আগাছার বন। জোছনায় ভেসে যাচ্ছে নির্জন প্রান্তর। আপনি সেই সরু-রাস্তায় স্ক্রাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোন দূর হতে যেন এগিয়ে আসছেন। আপনার মুখে ক্লান্ত হাসি।’
এটুকু লিখে থামল নির্ঝর। এরপর অন্য পাতায় যা লিখল তা এরকম, ‘আপনার ক্লান্ত আর নির্মল হাসি দেখে আমি চিন্তামুক্ত হলেও এক বুনোগন্ধের আচ্ছন্নতায় মগ্ন হয়ে গেলাম। আফ্রিকায় এমনি জোছনাধোয়া মধ্যরাতে আমি বেরিয়ে পড়তাম। চটচট চাকার আওয়াজ তুলে আমার গাড়ি ছুটত শহর ছেড়ে অনেক দূরে। মনে হতো থেমে থাকা বাতাস সময়ের কোলের ভেতর যেন উষ্ণতা খুঁজছে। মৃদু শীত শীত জোছনাধোয়া সেই রাতগুলো! বনের ভেতর দিয়ে বহমান রাস্তার ওপর কে এলো দেখার জন্য চাঁদটাও যেন নিচে নেমে এসেছে আরো একটু। আকাশ আর প্রকৃতি শুধু আমার হয়ে যেত। জোছনাধোয়া চাঁদটা আরো বেশি স্নিগ্ধ। লম্বা-ঘাস গাছের আড়ালে যে ছায়া তার ভেতরে কিসের যেন ম্লান লয়।
আফ্রিকার বিস্তৃত নিঃসঙ্গ বিশ্বরোড়ের একপাশে চুপ করে বসে থাকতাম। কৃত্রিম সব আলো নিভিয়ে। আমার মুখে, হাতে এসে পড়ত এক ফালি চাঁদের আলো। নিজকে প্রকৃতির অংশ মনে হতো। নির্মোহ আমার সব তন্ত্রীতে তখন মিলনরত নারীর মতো প্রকৃতির বুনো গন্ধ। মৃদু কুয়াশাবলয়ের স্তর আমাকে বেদনাবিধূর অনুপ্রেরণায় কোথায় ভাসিয়ে নিত। ভাবছেন অনুপ্রেরণা কেন বেদনা-বিধূর? জানি না। শব্দটা সঠিক হলো কিনা তাও জানি না। তবে মনকে সুদূরে ভাসিয়ে নিতে সবকিছু ত্যাগ করে আনন্দ পেতে তেমন অনুপ্রেরণাই জীবনে প্রয়োজন বলে আমি বিশ্বাস করি। স্তব্ধ আমার হৃদয়, মুগ্ধ মন ভেসে যায় জোছনার প্লাবনে। স্টিয়ারিংয়ে রাখা আমার দু’হাত নির্মল এক জীবন-গন্তব্যকে স্পর্শ করে নিমগ্ন শান্তিতে। আপনি কখনো এমন অনুভবে আক্রান্ত হয়েছেন? হয়েছেন নিশ্চয়ই। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের একা বোধে পেয়ে বসার প্রবণতা বেশি। শিশিরভেজা স্বপ্নরা চারদিক থেকে উঁকি দিলে মনের অকারণ ভাবনারা অতৃপ্তি আর তৃপ্তির মাঝের সুখ অনুরণনে বিলাসী হয়ে ওঠে। স্বপ্ন কুড়ানো এক যুবক তার প্রিয় কোনো মুখকে কল্পনা করে। লুকোচুরি খেলা আবেগগুলো কল্পিত এক নারীর সাথে স্বপ্ন-ভেলায় সারথী হয়। তারপর? গাড়ি থেকে নেমে সেই আধো-আলো, আধো-অন্ধকারেই সেই নারীর হাত ধরি। জোছনার আলো-মাখা হৃদয়ের সেই অপ্সরার আঙুল স্পর্শ ভাষাহীন আমাকে কোথায় যেন নিয়ে যায়। দূর আকাশের পথে... তারপর? একসময় সে আমার কাঁধে তার ঘুম ঘুম শরীর এলিয়ে দেয়। ভোর হয়ে আসে। রাতের নীরবতা আড়মোড়া ভাঙে। কেটে যায় জীবনের অনন্য কিছুক্ষণ! কার ভাবনায়? কিসের অনুপ্রেরণায়? স্বপ্নে দেখা দৃশ্যগুলোর কথা লিখতে গিয়ে, দেখুন, কেমন বিচ্ছিরি করে নিজের অনুভূতির কথা লিখলাম। অনুভূতি হয়তো এক ধরনের স্বপ্নের মতো। অথবা স্বপ্নরা হয়তো আসে আমাদের অনুভূতির পাখনায় ভর করে।
আমি জানি আপনি আমার এ চিঠি পাবেন না। কারণ সেদিন বাসে আমার নিজের নাম নির্ঝর বলেছি বলে হয়তো আপনি আপনার নাম ‘নওরিন’ শব্দে আড়াল করেছেন (যদিও আমি তা বিশ্বাস করি না)। কী জানি আমরা হয়তো সারাজীবনের জন্য হারিয়ে যাব কি না। যে মানবী মনের মাঝে এক ধরনের ‘মায়া’ তৈরি করে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়; তার কথা মনে হলেই আমার আফ্রিকার নির্জনতর নিমগ্নতায় জোছনার মায়া বিস্তারকারী চাঁদটার কথা মনে হবে। কেন হবে তাও জানি না...’
চিঠি লেখা শেষ করে খামে চিঠি ভরানোর সময় নির্ঝরের মনে হলো স্বপ্নের কথা কিছুই লেখা হলো না। নওরিনের কাছে এই চিঠি পৌঁছানো নিয়ে তার মনে সন্দেহ রয়ে গেল। ঠিকানা না জানার অনিশ্চয়তার রেশ ধরে নির্ঝর খামে চিঠি ভরিয়ে মনে মনে সে নওরিনের ঠিকানা গুছিয়ে নেয়। তারপর হঠাৎ-ই সে সিদ্ধান্ত নিল নওরিনকে এই চিঠি সে পাঠাবে না। মাত্র একদিনের সহযাত্রী এক নারীকে ব্যক্তিগত অনুভূতিভরা চিঠি লেখা দুর্বল ব্যক্তিত্বের পুরুষের লক্ষণ। অন্তত স্বপ্নে দেখা প্রিন্সেস-মাহজাবিন নামের নারীর সাথে যার এত সাদৃশ্য- তার কাছে চিঠিটা পাঠাতে মন থেকে সে সায় পাচ্ছে না।
কিন্তু রসুল চাচার অসাধারণ কর্তব্যবোধে নির্ঝরের টেবিলে পড়ে থাকা চিঠিটির গন্তব্য নির্ধারিত হয়ে যায়। ঘুরে ঘুরে চিঠিটা শেষ পর্যন্ত বাংলা বিভাগের প্রধানের হাতে পৌঁছে।
সন্ধ্যা নামার আগেই কয়েকবার চিঠিটা পড়ল নওরিন। কাউকে চিঠি লেখা আর কারো কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার কী অনুভূতি তা সে শুধু বড়দের কাছ থেকে গল্পে গল্পে শুনেছে। কিন্তু মোবাইলের এই যুগে, পত্র পাওয়ার মতো বিরল ঘটনা তার জীবনে প্রথম ঘটল।
এমন ঘটনায় প্রথম প্রথম হাসিই পেয়েছিল নওরিনের। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত যত গভীর হলো তুচ্ছ সেই চিঠি কী এক অমোঘ আকর্ষণে নওরিনকে ঘুমাতে দিল না। সে বারান্দায় পায়চারী করল, থামল। পিলারে মাঝে মাঝে হেলান দিয়ে আকাশ দেখল। আফ্রিকার সেই আকাশ কল্পনায় আঁকল। সে আবার চিঠিটা পড়ল। যতবার পড়ল ততবার যেন নিজকে খুঁজে পেল। যত না চিঠি, তারচেয়ে বেশি সেই পাণ্ডুলিপির পটভূমির প্রকৃতি আর ভাষা যেন চিঠির ভেতর দিয়ে চোখ মেলল। নওরিনের মনে হলো, সে উপন্যাসে বর্ণিত ঐসব প্রকৃতি আর জায়গাতে নিজেই যেন ছিল যুগ যুগ ধরে।
নির্ঝরের চিঠি পড়ে আফ্রিকা দেখার প্রবল ইচ্ছা চিনচিন অনুভবের মতো আজ জেগে উঠছে। নির্জন বনভূমির জোছনায় কুয়াশার হালকা বলয়ের ভেতরে, অনেক প্রাণের একজন হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। এটা কি এমন ইচ্ছার বয়স? ভাবল সে।
নওরিনের খুব ইচ্ছে করল, চিঠির জন্য ধন্যবাদ দিয়ে লম্বা একটা চিঠি লিখতে। কিন্তু সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, চিঠি সে ঠিকই লিখবে কিন্তু কখনো পোস্ট করবে না। ইচ্ছের সাথে তার মনের দ্বন্দ্ব কেন- এভাবে নিজেকে প্রশ্ন করে একটা অবসন্ন ভাসা ভাসা উত্তর পেল নওরিন। ভদ্রলোক নিজ থেকে তার জন্য দু’পা হাঁটুক। নারী মনের তাতেই পরিতৃপ্তি। তার জন্য অন্য কারো আগ্রহ, অথবা ভালোবাসা সে ঝালিয়ে নিতে চায়? কী লাভ তাতে? লাভ-ক্ষতি নওরিন ভাবতে চায় না। শুধু চায় ভদ্রলোক তার ব্যাপারে উঁচাটন হয়ে থাকুন। পাণ্ডুলিপিটা হাতে পেয়ে বেশ হয়েছে। যদিও এই ইন্টারনেটের যুগে পাণ্ডুলিপির আরেক কপি যোগাড় করা তার জন্য কোনো ব্যাপার নয়। তবুও। ইস যদি এমন হতো? পাণ্ডুলিপিটার সফট্ কপি, হার্ডকপি দুটোই মূল লেখকের কাছ থেকে কোনো এক অদৃশ্য কারণে হাওয়া হয়ে গেল। একটামাত্র কপি। যেটা এখন তার হাতে! কী যে ভালো হতো। কিন্তু নওরিন ভেবে পেল না, সে কেন পাণ্ডুলিপি আর নির্ঝরকে নিয়ে কল্পনার এমন উদ্দাম ঘোড়ায় চেপেছে। কোত্থেকে কবি কবি অনুভূতি পেয়ে বসল নওরিনকে। রুমে গিয়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বালল সে। পাশের বেডে ঘুমানো শাম্মা গলায় মাদকতা মিশিয়ে বলল,
শুয়ে পড়। ঘুম তোর প্রয়োজন। ঘুম না এলে, পায়ে নিজের পা ঘষে নিবি। নিজের শরীরকে আলিঙ্গন করতে করতে ঘুমানো উফ্... কী যে মজা। নওরিন বিরক্ত হয়ে বলল,
পড়াশুনা বাদ দিয়ে তুই বরং বিয়ে কর।
আমার বরের কী আর আমার মতো মোলায়েম পা হবে? মাখন-মাখন, নরম-নরম!
তুই যে কী শাম্মা!
আর যা-ই হই, ছেলেমানুষের কালচে রোমশ পা কল্পনা করে আমি বিয়ের ব্যাপারটায় তোদের মতো আগ্রহ পাই না।
নওরিনের মুখে খারাপ কথা এসে গিয়েছিল প্রায়। নিজেকে সামলে নিল সে। কোনো কথা না বলে পাণ্ডুলিপির ওপর মোটা বড় হরফে কারুকার্যময় লেখাটায় সে অনেকক্ষণ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকল। খুব ইচ্ছে করল, উপন্যাসটা খুলে, আফ্রিকার গভীর বন পেরিয়ে খুঁজে পাওয়া এক চিলতে সমতলভূমি, একটা আঁতুড়ঘর আর বেঁচে থাকার জন্য, জীবনের জন্য প্রাণান্ত আকুতির মুহূর্তগুলোর কাব্যিক লগ্নগুলোতে আবার ডুব দিতে। উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়ানো দৃশ্যকল্পগুলো নওরিনের নিজের অতিক্রম করা জীবন যেন।
নওরিন কি নিজেই এমন কিছু সৃষ্টি করতে চেয়েছিল? তার মনে পড়ল ত্রিমোহিনীর কিংবদন্তি গল্পবলিয়ের কথা। গল্পের চেয়ে ভাষার মায়াজালেই যিনি দখল করতেন শ্রোতার অন্তর্লোক। নওরিনের বার বার ভুল করে শুধু মনে হলো, এই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি গল্পবলিয়ে শুভ্রর ভাষারই কথন। সত্যি, কোনোদিন যদি উপন্যাসের লেখকের সাথে দেখা হয়? শীতল হয়ে এলো নওরিনের স্নায়ুর সজাগ উত্তাপ। যদি হয়?
তাহলে লেখককে সে জিজ্ঞাসা করবে পুরুষ হয়েও একজন নারীর ‘মিসক্যারেজ’ হওয়ার ক্ষণটুকুতে ঐ নারীর ওমন জীবন্ত অনুভূতি তিনি কীভাবে অনুভব করলেন?
বরং কিছু লেখার জন্য আবেগি, ঈশ্বরী এক হৃদয়ের টলমল বেদনায় আপ্লুত হয়ে উঠল নওরিনের কলম। হাতে কাগজ-কলম নিয়ে নির্ঝরের চিঠির উত্তর লেখার পরিকল্পনা করামাত্র হু হু করে স্মৃতিপটে ভেসে উঠল অন্ধকার বর্ষাভেজা এক রাত। নওরিন লিখল,
নির্ঝর,
আপনাকে কীভাবে সম্বোধন করলে ভালো হতো জানি না। আর যেহেতু আমি জানি এ চিঠি কোনোদিন পোস্ট করতে পারব না, সুতরাং আমি দ্বিধাহীন। আপনি মোবাইলে মেসেজ পাঠালে সাথে সাথেই একটা মেসেজ পাঠাতে পারতাম। কিন্তু কী আশ্চর্য! চিঠি বলেই ব্যাপারটা এমন হচ্ছে। আমার মানসিক স্তরের যে মানবিক লজ্জা, মূল্যাবোধ অথবা কিছু যেন একটা আমি ঠিক গুছিয়ে লিখতে পারছি না; আমাকে আপনার কাছ থেকে আড়াল করে ফেলছে। অথচ মজার ব্যাপার আমি যত আড়াল হয়ে যাচ্ছি, তত যেন আপনাকে বুঝতে চাইছি। আমার ভেতরে জেগে ওঠা এক প্রবল নারীসত্তা আপনাকে খুব সহজেই চিনে নিতে পারছে না। মোবাইলে কথা বললে যেটা হয়ত কোনোদিন হতো না। কোনো একটা বিষয় শেখার চেয়ে তা অনুভূতি দিয়ে স্পর্শ করলেই উপলব্ধির জগৎ সমৃদ্ধ হয়ে যায়। আপনার ছোট্ট এক চিঠি আমাকে তাই-ই শেখাল।
আপনি চমৎকার লেখেন। বোঝা যায় কিছু না হলেও ডায়েরি লেখার অভ্যাস আপনার অবশ্যই আছে। ভাবতে অবাক লাগে আমার মতো সাদামাটা এক মেয়ে হঠাৎ করে কত ভাগ্যবতী হয়ে যায়। আপনার জন্য নয় স্যার, আপনার দেওয়া অসাধারণ পাণ্ডুলিপিটার জন্য। বই হয়ে ওঠার আগে, অনেক অনেক মানুষের নিজের সম্পত্তি হয়ে ওঠার আগে পাণ্ডুলিপিটা এখন আমার হাতে। এ এক দারুণ অনুভূতি!
আপনাকে চিঠি লিখছি মানে আমি আসলে নিজের সাথে কথোপকথোন করছি। নিজের স্মৃতিলোক অথবা ভালো-খারাপ লাগার পূর্বাপর নিয়ে বলতে পারেন মনের রঙতুলিতে ইচ্ছে মতোন আঁকাআঁকি করছি।
আমি জানি না, আমি এসব কেন লিখছি? আপনার চিঠি আর উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি (যদিও সেটা আপনার লেখা নয়) আমার ভেতরকে হয়তো উসকে দিয়েছে। সব আগুনের তাপ যে একরকম হয় না; তা আমার লেখা পড়লেই বুঝতে পারবেন। তাছাড়া কোনোদিন এ চিঠি হয়তো পোস্ট করব না এমন ভাবনাটাও এসব বকবকের কারণ। সুতরাং চিঠিটা এলোমেলো হলে কিছু এসেও যায় না।
আজ থাক; শাম্মার বেঘোর আয়েশী ঘুম দেখে আমার খুব ঘুমাতে ইচ্ছা করছে।
আজ রাতের আঁধারগুলোর ভেতরে যতগুলো প্রদীপ জ্বালানো সম্ভব; সবগুলো প্রদীপ আপনার হোক। তারপরও থাকবে আঁধার। গুচ্ছ-গুচ্ছ আঁধার; সেটুকু না হয় আমার হোক। আপনার মঙ্গল কামনা করছি।
নওরিন
নিজের নাম লেখা শেষে শেষ লাইন তিনটায় চোখ বুলাল নওরিন। কয়েকবার। কেন সে কথাগুলো লিখল এ কথাগুলোর অর্থ-ই বা কী, সে বুঝল না। জীবনে কী সবকিছুর অর্থ খুঁজতে হয় নওরিন?-এমন উত্তর নিজেকে নিজে দিয়েই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল যেন সে বুঝে গেল- অনর্থক ব্যাপারগুলো লিখতে পারাটাই তার পুরো চিঠির একমাত্র কৃতিত্ব। কারণ চিঠির ভেতর ঘটনাপ্রবাহের বাইরে যে সব অনর্থক ব্যাপার এসেছে, তখনই ওর মনের সংযোগ বেশি ঘটেছে। নিজের অনুভবের সাথে আপ্লুত আবেগে ভেসে যাওয়ার সময় মানুষের জীবনে আর কতবারই বা আসে?
আরও পড়ুন: কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ | ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব–৩