কেউ প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর, কেউ প্রথম আদিবাসী নারী সিনেটর। কেউ আবার মাত্র ২৭ বছর বয়সে অঙ্গরাজ্যের সিনেটে জায়গা করে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, বয়স ও সামাজিক পটভূমির নারীদের বিজয় নতুন করে আলোচনায় এনেছে রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি।*
রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নারীদের উপস্থিতি বাড়লেও নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছানোর পথ এখনো অনেকের জন্য সহজ নয়। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, জাতিগত পরিচয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের পুরুষপ্রাধান্য—বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে তাঁদের এগোতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী নারীদের গল্পে উঠে এসেছে এমনই কিছু পরিবর্তনের চিত্র।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে গভর্নর, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জয় পেয়েছেন নারীরা। তাঁদের কেউ নিজ অঙ্গরাজ্যে প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন, কেউ আবার জাতীয় রাজনীতিতে এমন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যাঁদের উপস্থিতি একসময় ছিল খুবই সীমিত।
গভর্নর পদে নতুন ইতিহাস
যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্যগুলোর সর্বোচ্চ নির্বাহী পদ গভর্নর। এই পদে নারীদের অংশগ্রহণে এবার এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। জর্জিয়া, নিউ মেক্সিকো, টেক্সাস ও ওহাইওর নির্বাচনে জয়ী নারীরা নিজেদের রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছেন।
জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন কিশা ল্যান্স বটমস (Keisha Lance Bottoms)। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর। এর পাশাপাশি জর্জিয়ার প্রথম নারী গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি। এর আগে আটলান্টার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বটমস। স্থানীয় প্রশাসনে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার রাজ্যের সর্বোচ্চ নির্বাহী দায়িত্বে যাচ্ছেন তিনি।
নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেব হালান্ড (Deb Haaland)। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী আমেরিকান নারী গভর্নর। লেগুনা পুয়েবলো সম্প্রদায়ের সদস্য হালান্ড এর আগে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়ে আদিবাসী নারীদের জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও ইতিহাস গড়েছিলেন তিনি।
টেক্সাসের প্রথম লাতিনা গভর্নর হতে যাচ্ছেন জিনা হিনোজোসা (Gina Hinojosa)। রাজ্যের আইনসভায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। নির্বাচনী প্রচারে শিক্ষা সংস্কার, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে, চিকিৎসক অ্যামি অ্যাক্টন (Amy Acton) নির্বাচিত হয়েছেন ওহাইওর প্রথম নারী গভর্নর। জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ওহাইওর জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি।
আরও কয়েকটি রাজ্যে নারীদের নেতৃত্ব
এবারের নির্বাচনে শুধু নতুন মুখই নয়, বিভিন্ন রাজ্যে নারী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাও দেখা গেছে।
টেনেসির প্রথম নারী গভর্নর হতে যাচ্ছেন মার্শা ব্ল্যাকবার্ন (Marsha Blackburn)। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মিনেসোটার প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন অ্যামি ক্লোবুচার (Amy Klobuchar)। তিনি এর আগে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ ছাড়া মিশিগানে জোসেলিন বেনসন (Jocelyn Benson), আরকানসাসে সারা হাকাবি স্যান্ডার্স (Sarah Huckabee Sanders), ওরেগনে টিনা কোটেক (Tina Kotek), নিউ হ্যাম্পশায়ারে কেলি আয়োট (Kelly Ayotte) এবং রোড আইল্যান্ডে হেলেনা ফোলকস (Helena Foulkes) গভর্নর নির্বাচিত বা পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর আমেরিকান উইমেন অ্যান্ড পলিটিকসের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ১৭টি অঙ্গরাজ্যে নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি নতুন রেকর্ড।
সিনেটে নারীদের প্রতিনিধিত্বে নতুন অধ্যায়
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আইনসভা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। মিনেসোটার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পেগি ফ্লানাগান (Peggy Flanagan) নির্বাচিত হয়েছেন সিনেটর হিসেবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম আদিবাসী আমেরিকান নারী সিনেটর। ওজিবওয়ে সম্প্রদায়ের সদস্য এবং হোয়াইট আর্থ নেশনের সঙ্গে যুক্ত ফ্লানাগান দীর্ঘদিন আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করেছেন।
ইলিনয় থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন জুলিয়ানা স্ট্র্যাটন (Juliana Stratton)। তাঁর বিজয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে একই সময়ে দায়িত্ব পালন করবেন তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী। অন্য দুজন হলেন ডেলাওয়্যারের লিসা ব্লান্ট রচেস্টার এবং মেরিল্যান্ডের অ্যাঞ্জেলা অলসোব্রুকস।
অন্যদিকে, সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে নির্বাচিত অ্যানি অ্যান্ড্রুস (Annie Andrews) রাজ্যটির প্রথম নির্বাচিত নারী সিনেটর হতে যাচ্ছেন। পেশায় চিকিৎসক অ্যান্ড্রুস শিশুস্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করেছেন।
তরুণ ও ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নারীদের উত্থান
এবারের নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কলোরাডোর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ২৯ বছর বয়সী মেলাত কিরোস (Melat Kiros)। তরুণ বয়সেই জাতীয় আইনসভায় জায়গা করে নেওয়া তাঁর রাজনৈতিক যাত্রায় নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।
নিউইয়র্কের সপ্তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত ক্লেয়ার ভালদেজ (Claire Valdez) রাজ্যটির প্রথম আদিবাসী নারী কংগ্রেস সদস্য। তাঁর বিজয় আদিবাসী নারীদের জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
নেব্রাস্কা থেকে নির্বাচিত ডেনিস পাওয়েল (Denise Powell) হবেন রাজ্যটির প্রথম লাতিনা কংগ্রেস সদস্য। তাঁর বিজয়ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় জাতিগত বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
আর ইলিনয়ের ২৬তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে অঙ্গরাজ্যের সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন ২৭ বছর বয়সী নাবিলা সৈয়দ (Nabeela Syed)। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম এই তরুণী এর আগে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ইলিনয়ের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার রিপাবলিকান প্রার্থী ডারবি হিলসকে পরাজিত করে অঙ্গরাজ্যের সিনেটে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বিজয় তরুণ ও মুসলিম নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে এনেছে।
প্রতিনিধিত্ব বাড়লেই কি সব বাধা দূর হয়?
নির্বাচনে নারীদের এমন সাফল্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কয়েকটি ঐতিহাসিক বিজয় মানেই রাজনীতিতে নারীদের জন্য সব বাধা দূর হয়ে গেছে, এমন নয়। এখনো নির্বাচনী অর্থায়ন, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব, প্রচারণায় বৈষম্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তবে এবারের নির্বাচনের ফলাফল একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—নারীরা শুধু ভোটার কিংবা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই নয়, নীতিনির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিক, চিকিৎসক, আইনজীবী, তরুণ সংগঠক এবং বিভিন্ন জাতিগত ও সামাজিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি।
একজন নারী যখন নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছান, তখন তাঁর অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর উপস্থিতি অন্য নারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ তাই কেবল প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়; এটি সমাজের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও মতামতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন সেই পরিবর্তনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তুলে ধরেছে। আর এসব নারীর পথচলা মনে করিয়ে দেয়, নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হলে নারীরাও নিজেদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারেন।