বারবিকিউ খাবারের প্রতি অনেকেরই আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। মাংস, মাছ কিংবা সবজি—আগুনের আঁচে গ্রিল করে তৈরি এসব খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ সহজেই জিভে জল আনে। বিশেষ করে শীতের মৌসুমে বারবিকিউ পার্টি যেন বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ। তবে স্বাদের পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে, বারবিকিউ খাবার কি সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো? নাকি নিয়মিত এ ধরনের খাবার খেলে বাড়তে পারে নানা রোগের ঝুঁকি?
পুষ্টিগুণের দিক থেকে কেমন বারবিকিউ?
বারবিকিউ করার সময় সাধারণত খাবার সরাসরি আগুনের আঁচে বা গ্রিলের ওপর রান্না করা হয়। এতে অতিরিক্ত তেল ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। ফলে ডুবোতেলে ভাজার তুলনায় বারবিকিউ করা খাবারে চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ কম হতে পারে। বিশেষ করে মুরগির বুকের মাংস, মাছ এবং বিভিন্ন সবজি গ্রিল করে খেলে পাওয়া যায় প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।
তবে খাবারটি কতটা স্বাস্থ্যকর হবে, তা নির্ভর করে কী দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে, কীভাবে রান্না করা হচ্ছে এবং কতটা খাওয়া হচ্ছে তার ওপর।
অতিরিক্ত পোড়া খাবারে বাড়ে ঝুঁকি
বারবিকিউ খাবারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অতিরিক্ত তাপে রান্না। মাংস সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে এলে বা অনেকক্ষণ উচ্চ তাপে রান্না করলে কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে মাংসের চর্বি আগুনে পড়ে ধোঁয়া তৈরি করলে পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (PAHs) তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে মাংসের প্রোটিন ও ক্রিয়েটিন উচ্চ তাপে বিক্রিয়া করে হেটারোসাইক্লিক অ্যামাইনস (HCAs) তৈরি করতে পারে। এসব রাসায়নিকের কিছু নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মানুষের ক্ষেত্রেও এ নিয়ে গবেষণা চলছে।
তাই মাংস অতিরিক্ত পুড়িয়ে খাওয়া কিংবা পোড়া কালো অংশ নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
মেরিনেশনেও থাকতে হবে সতর্কতা
বারবিকিউয়ের আগে মাংস মেরিনেট করতে অনেকেই বিভিন্ন সস, চিনি, লবণ ও মসলা ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত লবণ ও চিনিযুক্ত সস খাবারের পুষ্টিমানকে কম স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে। বরং লেবুর রস, আদা, রসুন, হলুদ, গোলমরিচ ও বিভিন্ন ভেষজ মসলা দিয়ে মেরিনেট করা ভালো। কিছু গবেষণায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ মেরিনেড ব্যবহারে উচ্চ তাপে ক্ষতিকর যৌগ তৈরির পরিমাণ কমতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কীভাবে বারবিকিউ খাবার স্বাস্থ্যকর করবেন?
বারবিকিউ খাবার উপভোগ করতে চাইলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
মাংস সরাসরি আগুনের শিখায় না দিয়ে মাঝারি তাপে রান্না করুন।
মাংসের অতিরিক্ত চর্বি ছেঁটে ফেলুন, যাতে আগুনে পড়ে বেশি ধোঁয়া তৈরি না হয়।
মাংস অতিরিক্ত পোড়াবেন না। কালো হয়ে যাওয়া অংশ ফেলে দিন।
রান্নার আগে লেবু, আদা, রসুন ও মসলার মিশ্রণে মেরিনেট করুন।
প্রক্রিয়াজাত মাংস যেমন সসেজ, বেকন ও সালামির পরিবর্তে মাছ, মুরগি ও তাজা সবজি বেছে নিন।
বারবিকিউয়ের সঙ্গে সালাদ, শসা, টমেটো ও অন্যান্য সবজি রাখুন।
কাঁচা মাংসের জন্য ব্যবহৃত প্লেট ও সরঞ্জাম রান্না করা খাবারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করবেন না। মাংস ভালোভাবে সিদ্ধ হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করুন।
তাহলে কি বারবিকিউ খাওয়া বন্ধ করতে হবে?
না, বারবিকিউ খাবার মানেই অস্বাস্থ্যকর নয়। বরং সঠিক উপকরণ নির্বাচন, পরিমিত খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর রান্নার পদ্ধতি অনুসরণ করলে এটি সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত পোড়া মাংস, প্রক্রিয়াজাত মাংস এবং অতিরিক্ত লবণ-চিনিযুক্ত সস এড়িয়ে চলতে হবে।
মনে রাখতে হবে, খাবারের স্বাদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রান্নার পদ্ধতিও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই বারবিকিউয়ের আনন্দ উপভোগ করুন, তবে সচেতনভাবে।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)