একই কথা বারবার বলার অভ্যাস পাল্টানো কতটা দরকার


ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

কেউ আপনার কথা না শুনলে বিরক্তি, অভিমান কিংবা রাগ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একই কথা বারবার বললেই কি মানুষ আপনার কথা বুঝতে পারে? অনেক সময় উল্টো ফল হয়। সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ে, কথোপকথনে তৈরি হয় বিরক্তি। তাই কাউকে বোঝাতে হলে শুধু কী বলছেন, তা নয়—কীভাবে বলছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।


আমরা প্রতিদিনই নানা বিষয়ে কথা বলি। কখনো পরিবারের সদস্যের সঙ্গে, কখনো জীবনসঙ্গী, সন্তান, বন্ধু কিংবা সহকর্মীর সঙ্গে। নিজের প্রয়োজন, অনুভূতি, প্রত্যাশা কিংবা অভিযোগ তুলে ধরি। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, সামনের মানুষটি কথার গুরুত্ব দিচ্ছেন না। একই কথা কয়েকবার বলার পরও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। তখন আমরা আরও জোর দিয়ে বলতে শুরু করি। কখনো কণ্ঠস্বর উঁচু করি, কখনো একই অভিযোগ বারবার সামনে আনি।


কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, একই কথা বারবার বলার পরও যদি কেউ না শোনেন, তাহলে আরও একবার বললে কি সত্যিই পরিস্থিতি বদলাবে?


মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যোগাযোগ কেবল কথা বলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মনোযোগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অনুভূতি বোঝা এবং অন্যের বক্তব্য শোনার মানসিকতা। তাই কাউকে বোঝাতে গিয়ে একই কথা বারবার না বলে যোগাযোগের ধরন বদলে দেখা যেতে পারে।


একই কথা বারবার বললে বিরক্তি তৈরি হয় কেন?


একই কথা বারবার শুনতে হলে অনেকের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কথার মধ্যে যদি অভিযোগ, দোষারোপ কিংবা নির্দেশ দেওয়ার প্রবণতা থাকে, তাহলে শ্রোতা মূল বক্তব্যের পরিবর্তে বলার ধরনটির প্রতিই বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন।


যেমন, সন্তান ঘর গোছায় না। তাকে বারবার বলা হচ্ছে, ‘ঘরটা গুছিয়ে রাখো’, ‘কতবার বলব, নিজের জিনিস নিজে গুছিয়ে রাখো!’ একপর্যায়ে সন্তান কথাটিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ হিসেবে না দেখে বিরক্তিকর বকুনি হিসেবে নিতে পারে।


একইভাবে জীবনসঙ্গীকে কোনো বিষয়ে বারবার অভিযোগ করলে তিনি সমস্যাটি বোঝার পরিবর্তে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। ফলে মূল সমস্যার সমাধান না হয়ে দুজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে।


তবে এর অর্থ এই নয় যে, কোনো কথা দ্বিতীয়বার বলা যাবে না। প্রয়োজনীয় বিষয়ে মনে করিয়ে দেওয়া স্বাভাবিক। সমস্যা তৈরি হয় যখন মনে করিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে একই অভিযোগ, একই ভাষা ও একই ভঙ্গি বারবার ব্যবহার করা হয়।


কথা বলার আগে বুঝুন, অন্য মানুষটি শুনতে প্রস্তুত কি না


আমরা অনেক সময় নিজের প্রয়োজন বা অভিযোগ জানানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু যাঁকে কথাটি বলছি, তিনি তখন মানসিকভাবে কথা শোনার অবস্থায় আছেন কি না, তা বিবেচনা করি না।


হতে পারে, তিনি কাজের চাপে আছেন, ক্লান্ত কিংবা অন্য কোনো চিন্তায় ডুবে আছেন। এমন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি যথাযথ মনোযোগ দিতে পারবেন না। তাই কথা বলার আগে জানতে চান, ‘তোমার সঙ্গে একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। এখন কি একটু সময় হবে?’


অভিযোগ নয়, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করুন


একই কথা বারবার বলার অন্যতম কারণ হলো নিজের অনুভূতি সঠিকভাবে প্রকাশ করতে না পারা। অনেক সময় আমরা সমস্যার কথা না বলে মানুষটির আচরণকে আক্রমণ করি।


যেমন, ‘তুমি কখনো আমার কথা শোনো না’—এমন বাক্যের পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আমি যখন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি এবং তুমি মনোযোগ দাও না, তখন আমার খারাপ লাগে। আমার কথা একটু মন দিয়ে শুনলে ভালো লাগবে।’


প্রথম বাক্যে অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় বাক্যে নিজের অনুভূতি ও প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছে। এ ধরনের যোগাযোগে অন্য ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতা কমতে পারে। তিনি আপনার অনুভূতি বোঝার সুযোগ পান।


প্রশ্ন করুন, শুধু নির্দেশ দেবেন না


কেউ আপনার কথা শুনছেন না বলে ধরে নেওয়ার আগে বোঝার চেষ্টা করুন, তিনি কেন বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না।


একই নির্দেশ বারবার দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্ন করতে পারেন—


- ‘তোমার কি মনে হয়, বিষয়টি এভাবে করা সম্ভব?’


- ‘এ কাজটি করতে তোমার কী সমস্যা হচ্ছে?’


- ‘আমরা দুজন মিলে কি অন্য কোনো সমাধান বের করতে পারি?’


প্রশ্ন করার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তিকে আলোচনায় যুক্ত করা যায়। এতে তিনি শুধু নির্দেশ পালনকারী নন, বরং সমস্যার সমাধানে অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠেন।


কখন থামতে হবে, সেটিও বুঝুন


সব কথার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। কেউ আপনার কথা শুনেও হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে চান না। আবার কেউ বিষয়টি বুঝতে কিছুটা সময় নিতে পারেন।


এমন পরিস্থিতিতে একই কথা বারবার বলার পরিবর্তে কিছুটা সময় দিন। প্রয়োজনে বলুন, ‘বিষয়টি নিয়ে তুমি ভেবে দেখো। পরে আমরা আবার কথা বলব।’


কথা বলার সময় উত্তেজনা বেড়ে গেলে সাময়িক বিরতি নেওয়াও ভালো। রাগের মুহূর্তে বলা কথা অনেক সময় মূল সমস্যার চেয়ে বড় ক্ষত তৈরি করে। তাই দুজনের মন শান্ত হলে আলোচনায় ফিরে আসুন।


মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কার্যকর যোগাযোগের জন্য শুধু নিজের বক্তব্য প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; অন্য ব্যক্তির বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনাও জরুরি। একে বলা হয় অ্যাকটিভ লিসেনিং বা সক্রিয়ভাবে শোনা।


যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সক্রিয়ভাবে শোনার কৌশলবিষয়ক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বক্তাকে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা, তাঁর বক্তব্য পরিষ্কারভাবে বোঝার চেষ্টা করা এবং নিজের ভাষায় তাঁর কথার সারাংশ তুলে ধরা কার্যকর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


ঢাকা বা বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট মনোবিদের সাক্ষাৎকার এখানে নেওয়া হয়নি। তাই নিচের পরামর্শটি মনোবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত যোগাযোগনীতির ভিত্তিতে তৈরি, কোনো বিশেষজ্ঞের সরাসরি উদ্ধৃতি নয়।


মনোবিদের পরামর্শ অনুযায়ী, একই কথা বারবার বলার প্রবণতা অনেক সময় নিজের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনানোর চেষ্টা থেকে তৈরি হয়। কিন্তু বারবার অভিযোগ বা নির্দেশ দেওয়ার ফলে অন্য ব্যক্তি বিরক্ত, প্রতিরক্ষামূলক কিংবা মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নিজের অনুভূতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা, অন্য ব্যক্তির অবস্থান বোঝার চেষ্টা করা এবং আলোচনার জন্য উপযুক্ত সময় বেছে নেওয়া বেশি কার্যকর।


মনোবিদদের পরামর্শের আলোকে কয়েকটি বিষয় অনুশীলন করতে পারেন—

- আগে শুনুন, পরে বলুন: অন্য ব্যক্তি কী বলতে চাইছেন, তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। মাঝপথে বাধা দেবেন না। তাহলে কথার মধ্যে বৈচিত্র আসবে।


- অভিযোগের বদলে অনুভূতি জানান: ‘তুমি আমাকে বোঝো না’ না বলে বলুন, ‘আমার মনে হচ্ছে আমার কথাটা ঠিকভাবে বোঝানো হচ্ছে না।’


- একটি বিষয়ে মনোযোগ দিন: পুরোনো সব অভিযোগ একসঙ্গে সামনে আনবেন না।


- সমাধান নিয়ে কথা বলুন: কে ভুল করেছেন, তা প্রমাণের চেয়ে কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দিন।


- প্রয়োজনে বিরতি নিন: রাগ বা অভিমান বেশি হলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন।


বিশ্ববিদ্যালয় অব আইওয়ার সংঘাত ব্যবস্থাপনা বিভাগের I স্টেসমেন্ট নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, ‘তুমি সব সময় এমন করো’ ধরনের অভিযোগের পরিবর্তে ‘আমি এমন অনুভব করি’ দিয়ে কথা শুরু করলে অপর পক্ষের কাছে বক্তব্যটি কম আক্রমণাত্মক মনে হতে পারে। এতে গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।


সম্পর্ক ভালো রাখতে কথার চেয়ে আচরণও গুরুত্বপূর্ণ


কখনো কখনো আমরা মনে করি, কাউকে ভালোবাসি বলেই তাঁর কাছ থেকে নিজের প্রত্যাশা পূরণের অধিকার আমাদের আছে। তাই একই কথা বারবার বলি, মনে করিয়ে দিই, অভিমান করি। কিন্তু ভালোবাসার সম্পর্কেও প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব চিন্তা, অনুভূতি ও সিদ্ধান্তের জায়গা রয়েছে।


আপনার কথা অন্য কেউ শুনবেন কি না, তা পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে আপনি কীভাবে কথা বলবেন, কতটা শ্রদ্ধা নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরবেন এবং অন্যের কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে শুনবেন, তা আপনার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।


মনে রাখবেন, যোগাযোগের উদ্দেশ্য কাউকে নিজের কথায় রাজি করানো নয়; বরং দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি করা। তাই একই কথা বারবার বলার আগে একবার ভাবুন, কথাটি কি অন্যভাবে বলা যায়? অভিযোগের জায়গায় কি অনুরোধ করা যায়? নির্দেশের জায়গায় কি আলোচনার সুযোগ রাখা যায়?


কারণ, অনেক সময় কথার পুনরাবৃত্তি নয়, কথার ধরন পরিবর্তনই সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে সাহায্য করে।


তথ্যসূত্র: বেটার হেলথ চ্যানেল রিলেশনশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশন


sidebar ad