প্রতিদিনের কিছু সহজ অভ্যাসেই ভালো রাখা যায় মস্তিষ্ক


ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, স্মৃতি ধরে রাখা, মনোযোগ দেওয়া থেকে শুরু করে শরীরের নানা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সঙ্গেই মস্তিষ্কের সরাসরি সম্পর্ক। তাই শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো মস্তিষ্কেরও প্রয়োজন যত্ন।


ব্যস্ত জীবনে কাজের চাপ, অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত স্ক্রিনে সময় কাটানো, অস্বাস্থ্যকর খাবার কিংবা দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা—এসব অভ্যাস মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য ভালো নয়। তবে মস্তিষ্ককে সক্রিয় ও সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিছু ছোট পরিবর্তন আনা যেতে পারে।


স্নায়ুরোগ ও স্পাইন সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. সৌমিত্র সরকার মস্তিষ্কের যত্নে নিয়মিত কিছু ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শগুলো অনুসরণ করে মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য দৈনন্দিন জীবনে কী কী করা যেতে পারে, চলুন দেখে নেওয়া যাক।


প্রতিদিন ১০ মিনিট মনোযোগ দিয়ে মেডিটেশন


মেডিটেশন বা ধ্যান মনকে শান্ত করার পাশাপাশি নিজের মনোযোগকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে কেন্দ্রীভূত করার অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। ব্যস্ততার মধ্যে প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট নিজের জন্য নির্ধারণ করুন।


শান্ত কোনো জায়গায় বসে চোখ বন্ধ করে শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। শুরুতে মন বারবার অন্যদিকে চলে যেতে পারে—এটাই স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে মনকে আবার নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন।


এই ছোট্ট সময়টুকু হতে পারে প্রতিদিনের মানসিক ব্যস্ততা থেকে নিজেকে একটু দূরে রাখার সুযোগ।


নিয়মিত হাঁটুন, ব্যায়াম করুন


মস্তিষ্কের যত্ন শুধু মানসিক অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শরীরকে সক্রিয় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিয়মিত হাঁটা থেকে শুরু করে ভারী ব্যায়াম—নিজের বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও অভ্যাস অনুযায়ী শরীরচর্চার রুটিন তৈরি করা যেতে পারে।

প্রতিদিনের ব্যস্ততায় দীর্ঘ সময় বসে থাকলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন। সম্ভব হলে হাঁটার জন্য আলাদা সময় রাখুন। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম পুরো শরীরের সুস্থতার পাশাপাশি মস্তিষ্ককেও সক্রিয় রাখার জীবনযাপন-অভ্যাসের অংশ হতে পারে।


প্রকৃতির মাঝে সময় কাটান


শহুরে জীবনে আমরা দিনের বড় একটি সময় ঘর, অফিস কিংবা যানবাহনের ভেতর কাটাই। অথচ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ মন ও শরীর—দুটির জন্যই প্রশান্তিদায়ক হতে পারে। সম্ভব হলে কিছুটা সময় খোলা জায়গায় কাটান। গাছপালা দেখুন, হাঁটুন, নির্মল বাতাস গ্রহণ করুন। ছুটির দিনে পার্ক, খোলা মাঠ কিংবা সবুজ কোনো জায়গায় কিছুটা সময় কাটানোর অভ্যাস করতে পারেন।

প্রকৃতির সঙ্গে এই সংযোগ প্রতিদিনের একঘেয়েমি থেকে সাময়িক বিরতি দেওয়ারও সুযোগ তৈরি করে।


শান্ত ও কম-ফ্রিকোয়েন্সির সংগীত শুনুন


সংগীত অনেকের মন ভালো করার একটি কার্যকর মাধ্যম। তবে মস্তিষ্কের যত্নের ক্ষেত্রে খুব উচ্চ শব্দের বদলে শান্ত ও কম-ফ্রিকোয়েন্সির সংগীত শোনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কাজের ফাঁকে কিংবা বিশ্রামের সময়ে পছন্দের শান্ত সংগীত শুনতে পারেন। তবে শব্দের মাত্রা যেন অতিরিক্ত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।

কখনো কখনো কয়েক মিনিটের শান্ত সংগীতও ব্যস্ত দিনের মধ্যে স্বস্তির একটি পরিসর তৈরি করতে পারে।


জাঙ্ক ফুড থেকে দূরে থাকুন


মস্তিষ্কের যত্নে খাবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাস কমিয়ে তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবারের দিকে মনোযোগ দেওয়া ভালো। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং খাবারের মান কেমন—এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। খাবারের ক্ষেত্রে শুধু স্বাদের দিকে না তাকিয়ে শরীরের প্রয়োজনের কথাও বিবেচনা করা উচিত।


ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন


মস্তিষ্কসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যারা ধূমপান করেন, তাঁদের ধীরে ধীরে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মানে শুধু নতুন ভালো অভ্যাস তৈরি করা নয়; ক্ষতিকর অভ্যাসগুলোও কমিয়ে আনা।


অতিরিক্ত চিনি খাওয়া কমান


মিষ্টি বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চিনি খাওয়ার অভ্যাস কমানো ভালো।


চা-কফিতে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি, মিষ্টিজাতীয় পানীয় কিংবা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। ধীরে ধীরে চিনি কমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।


অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এড়িয়ে চলুন


স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজ, পড়াশোনা ও যোগাযোগের প্রয়োজনে এগুলো ব্যবহার করতেই হয়। কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটানো এড়িয়ে চলা ভালো।


বিশেষ করে অবসর সময়ের পুরোটাই যেন মোবাইল বা অন্য কোনো ডিভাইসের সামনে না কাটে। দিনের মধ্যে কিছুটা ‘স্ক্রিন-মুক্ত’ সময় রাখুন। সেই সময় বই পড়া, হাঁটা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কিংবা অন্য কোনো পছন্দের কাজে ব্যয় করতে পারেন।


রাত জাগার অভ্যাস বাদ দিন


মস্তিষ্কের যত্নে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের গুরুত্ব রয়েছে। তাই অপ্রয়োজনে রাত জেগে থাকার অভ্যাস কমানো দরকার।

অনেকের ক্ষেত্রে রাতে মোবাইল দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কিংবা কাজের কারণে ঘুমের সময় পিছিয়ে যায়। প্রতিদিন মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।


মস্তিষ্কের যত্ন শুরু হোক আজ থেকেই


মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য সবকিছু একদিনে বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং ছোট ছোট অভ্যাস দিয়ে শুরু করাই সহজ। প্রতিদিন ১০ মিনিট মেডিটেশন, নিয়মিত হাঁটা, প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাটানো, শান্ত সংগীত শোনা, জাঙ্ক ফুড ও অতিরিক্ত চিনি কমানো, ধূমপান-অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ এবং রাত জাগার অভ্যাস বাদ দেওয়ার মতো পরিবর্তন ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা যায়।


মস্তিষ্ক আমাদের সারাজীবনের সঙ্গী। তাই শরীরের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কের প্রতিও যত্নশীল হওয়া জরুরি। ছোট ছোট ভালো অভ্যাসই হতে পারে সুস্থ ও সক্রিয় মস্তিষ্কের জন্য বড় বিনিয়োগ।

sidebar ad