প্রথম পিরিয়ড: ভয় নয়, আগে থেকেই প্রস্তুতি

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বাথরুমের দরজা বন্ধ করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ১১ বছরের মায়া। কয়েক মিনিট আগেও সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা একপাশে রেখে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাথরুমে ঢুকেছিল সে। কিন্তু হঠাৎ অন্তর্বাসে লালচে-বাদামি দাগ দেখে থমকে গেল। 


রক্ত!

কোথাও ব্যথা পেয়েছিল কি? ব্যথা তো করছে না! তাহলে রক্ত এল কোথা থেকে?


ভীতসন্ত্রস্ত মায়া কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দে, কাঁপা গলায় মাকে ডেকে দেখিয়ে বলল, 

“মা… আমি কি অসুস্থ?”

এই অবস্থায় কি হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?


মা হয়তো পরম মমতায় বুকে আগলে তাকে বলবেন, “না মা, তুমি অসুস্থ নও। ভয় পেয়ো না, এটা তোমার শরীর বড় হয়ে ওঠার স্বাভাবিক অংশ।" -এতে সে হয়তো কিছুটা আশ্বস্ত হবে। 


একটা মেয়ের প্রথম পিরিয়ড, শরীরের স্বাভাবিক একটি পরিবর্তন। কিন্তু অনেক মেয়ের কাছে প্রথম অভিজ্ঞতাটা হতে পারে ভয়, লজ্জা কিংবা বিভ্রান্তির। কিন্তু এই বিষয়টির সম্পর্কে মেয়েটির যদি আগে থেকেই ধারণা থাকতো, তাহলে একই ঘটনা তার কাছে আতঙ্কের নয়, বরং পরিচিত একটি পরিবর্তন মনে হতে পারতো। 


প্রথম পিরিয়ডের জন্য প্রস্তুতি আসলে কবে থেকে?


প্রথম পিরিয়ডের প্রস্তুতি আসলে প্রথম পিরিয়ডের দিন থেকে শুরু হওয়া উচিত নয়। প্রথম মাসিক সাধারণত বয়ঃসন্ধির একটি স্বাভাবিক অংশ। আর কোন বয়সে কার মাসিক শুরু হবে, এটা আগে থেকে ধারণা করা যায় না। আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (ACOG)-এর তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ মেয়ের প্রথম পিরিয়ড ১২–১৩ বছর বয়সের দিকে হয়; তবে বয়সের কিছুটা আগে-পরে হওয়াও স্বাভাবিক। সাধারণত স্তনের বিকাশ শুরু হওয়ার প্রায় ২–৩ বছর পর প্রথম মাসিক শুরু হয়। 


পিরিয়ড আসার আগেই শরীর অনেকটা পথ পেরিয়ে আসে। তাই “আর একটু বড় হলে বলব”—এই ধারণার বদলে বয়স উপযোগী করে ধীরে ধীরে শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে কথা বলা প্রয়োজন। স্তনের পরিবর্তন, শরীরের লোম, মুডের পরিবর্তন; এসবও বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক অংশ। এই ব্যাপারগুলো নিয়ে  জানা থাকলে তখন পিরিয়ডকে হঠাৎ আলাদা কোনো ঘটনা মনে হবে না।


পিরিয়ডের জন্য প্রস্তুত করা মানে শুধু প্যাড ব্যবহার শেখানো নয়। মূলত এখানে প্রস্তুতির তিনটি স্তর আছে- শরীরকে বোঝা → কী করতে হবে জানা → ভয় না পাওয়া। অর্থাৎ সে যেন কী ঘটবে, কেন ঘটবে এবং ঘটলে কী করতে হবে; সে ব্যাপারে সম্যক জ্ঞান অর্জন করে। 


পিরিয়ড শব্দটাকে গোপন বিষয় বানাবেন না


প্রতি মাসে বিশ্বজুড়ে ১৮০ কোটি মানুষের ঋতুস্রাব হয়। এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক, স্বাস্থ্যকর ও সাধারণ অংশ। তবুও, আধুনিকতার এই যুগে বাংলাদেশে ঋতুস্রাব একটি নিষিদ্ধ বিষয় হয়েই রয়ে গেছে, যা নীরবতা, সামাজিক কলঙ্ক এবং ভুল তথ্যের আবরণে ঢাকা। 


কারণ না জানলে স্বাভাবিক ঘটনাও ভয়ংকর লাগে। ইউনিসেফ-এর বাংলাদেশবিষয়ক ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিধি সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় অর্ধেক স্কুলছাত্রী তাদের প্রথম ঋতুস্রাব হওয়ার আগে এ সম্পর্কে কিছুই শোনেনি। ফলশ্রুতিতে অনেক মেয়ের প্রথম অভিজ্ঞতাই হতে পারে অপ্রস্তুত, বিভ্রান্ত এবং ভীত।   


এমন অনেক পরিবার আছে যেখানে পিরিয়ড নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে দ্বিধাবোধ করে। এই ব্যাপারে কথা বলা হয় ফিসফিস করে। “কাউকে বলবে না”, “এটা লুকিয়ে রাখবে”—যেন এটি এমন কোনো বিষয়, যা প্রকাশ্যে বলা যায় না। 


কিন্তু একটি মেয়ের কাছে তার শরীর সম্পর্কে কথা বলার জায়গাটিই যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে সে প্রথম পিরিয়ডের সময় ভয় পেলে কাকে প্রশ্ন করবে? তাই মেয়েকে বোঝাতে হবে; মাসিক কোনো রোগ নয়, কোনো অপরাধ নয়, লুকিয়ে রাখার মতো বিষয়ও নয়। বরং বয়ঃসন্ধিকালে মেয়ে শিশুর শরীরে কিছু পরিবর্তন; যেটা তাকে ধীরে ধীরে নারী শরীরের অধিকারী করে, সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা লাভ করে। প্রতি মাসেই হরমোনের প্রভাবে মেয়েদের জরায়ুতে পরিবর্তনের কারণে একটি নির্দিষ্ট সময়ে রক্ত এবং জরায়ু নিঃসৃত তরল পদার্থ বের হয়ে যায়। এটি শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া।



একদিনে বড় আলোচনা নয়


গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোরী মেয়েদের ঋতুস্রাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে তাদের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা তৈরি হয়। তারা জানে না কীভাবে নিরাপদে তাদের ঋতুস্রাব সামলাতে হয়। এর ফলে প্রজনন অঙ্গ ও মূত্রনালীর সংক্রমণের মতো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাদের মধ্যে জ্ঞানের এই সাধারণ অভাব শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং এটি আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিগত বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। 


এই উপলব্ধির ফলেই ঋতুস্রাব স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) কাজের জন্য পাঁচটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে:


- মেয়েদেরকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে সচেতন করুন।


- এমন রীতিনীতি তৈরি করুন যা ঋতুস্রাবকে স্বাস্থ্যকর ও ইতিবাচক হিসেবে দেখে।


- স্যানিটারি পণ্য, প্রবাহমান পানি, কার্যকরী শৌচাগার এবং গোপনীয়তার সুযোগ উন্নত করুন।


- মেয়েদের পরিবারের পক্ষ থেকে যত্ন ও সহায়তার উন্নতি সাধন করা।


- দক্ষ ও যত্নশীল স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে সহজলভ্যতা উন্নত করুন।


তাই একদিনে সব নয়, বরং সুযোগ বুঝে ছোট ছোট কথায় বিষয়টি পরিচিত করা যায়। মা নিজের পিরিয়ডের কথা স্বাভাবিকভাবে বলতে পারেন। প্যাড কিনতে গেলে মেয়েকে বোঝাতে পারেন এটি কী কাজে লাগে। শরীরে আসা বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করলে এড়িয়ে না গিয়ে বয়স উপযোগী উত্তর দিতে পারেন। 



প্রথম দিন কী হতে পারে, সেটাও জানুক


প্রথম পিরিয়ডে খুব বেশি রক্তপাত হবেই—এমন নয়। প্রথম পিরিয়ডের দিন বা তার শুরুতে রক্তপাত সাধারণত হালকা লাল বা বাদামী রঙের হতে পারে। অন্তর্বাসে বা টিস্যুতে সামান্য রক্ত বা দাগ দেখা যেতে পারে। এছাড়াও, আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (ACOG)-এর তথ্য অনুযায়ী  হরমোন সামঞ্জস্য হওয়ার কারণে প্রথম এক বা দুই বছর পিরিয়ড সাইকেল অনিয়মিত হতে পারে এবং প্রথম মাসিকে রক্তপাত প্রায় ২–৭ দিন স্থায়ী হতে পারে। রক্তপাতের সাথে এই সময়টাতে তলপেটে বা পিঠে হালকা ক্র্যাম্প বা টানটান ভাব অনুভব হতে পারে।


তাই মেয়েকে আগে থেকেই এসব ব্যাপারে জানিয়ে রেখে বলা যায়—


“একদিন অন্তর্বাসে হঠাৎ রক্তের দাগ দেখতে পারো। ভয় পেও না। আমাকে জানাবে।”


এই ছোট্ট প্রস্তুতিটাই প্রথম অভিজ্ঞতাকে অনেক কম আতঙ্কের করে দিতে পারে।


“স্কুলে হলে কী হবে?”—এই ভয়টাও কমাতে হবে


প্রথম পিরিয়ডের সবচেয়ে বড় ভয়গুলোর একটি হতে পারে—“স্কুলে যদি হয়ে যায়?” এই প্রশ্নের উত্তরও আগে থেকেই জানা থাকলে মেয়েটি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হবে। কিশোরী বয়সে পিরিয়ডের দিনক্ষণ অনেক সময় অনিয়মিত থাকে, তাই স্কুলে থাকা অবস্থায় হুট করে পিরিয়ড শুরু হয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে কিছু সহজ পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। 


স্কুলব্যাগে একটি ছোট পিরিয়ড পাউচ রাখা যেতে পারে। তাতে প্যাড, অতিরিক্ত অন্তর্বাস এবং প্রয়োজনীয় হাইজিন আইটেম রাখা যায়। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মহিলা শিক্ষিকা, কোনো বিশ্বস্ত বান্ধবী বা বড় আপুর সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মেয়েটিকে জানানো, কোনো দুর্ঘটনা বা দাগ লেগে গেলে সেটি নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছুই নেই। 


বাংলাদেশে পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব নিয়ে সামাজিক ট্যাবু (stigma) এবং স্কুলগুলোতে নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব মেয়েদের শিক্ষাজীবনে একটি বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ২.৫ দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকার কারণে তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের আত্মবিশ্বাস ও সাফল্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।


২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি ক্রস-সেকশনাল সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ২৭.৩% থেকে ৩৫% কিশোরী মাসিকের দিনগুলোতে স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। 


এছাড়াও, ২০২৬ সালের ২৮ মে বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস উপলক্ষে 'ইউনিসেফ বাংলাদেশ' এবং 'মাসিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা(MHM)'  প্ল্যাটফর্ম  যৌথভাবে দেশব্যাপী বিশেষ সচেতনতা ও গল্প বলার ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছে। ইউনিসেফের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব স্কুলে "মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন কর্নার" বা প্যাড ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল ওয়াশ (WASH) সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেখানে মেয়েদের স্কুলে উপস্থিতির হার প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। 


অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত হাইজিন-এর নয়; জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস, স্কুলে থাকা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ও স্কুলে ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য শিক্ষা এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন, প্রাইভেসি এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদির সরবরাহ থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।


ছেলেদেরও জানা দরকার


পিরিয়ডের শিক্ষা শুধু মেয়েদের জন্য নয়। ইউনিসেফ বলছে, ছেলেদেরও বয়স উপযোগীভাবে ঋতুস্রাব সম্পর্কে শেখানো দরকার। যাতে তারা বুঝতে পারে এটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া এবং এটা নিয়ে ঠাট্টা, টিজিং বা বুলিং করা গ্রহণযোগ্য নয়।


কারণ একটি মেয়ের ভয় শুধু রক্ত দেখার কারণে নয়। কখনো ভয়টা হয়—


“কেউ দেখে ফেললে?”


“বন্ধুরা হাসবে না তো?”


সমাজ থেকে পিরিয়ড নিয়ে ট্যাবু, লজ্জা এবং ভয় দূর করতে হলে ছেলেদের এই বিষয়ে সঠিক শিক্ষা ও ধারণা দেওয়ার বিকল্প নেই। ছেলেরা যখন এই বিষয়ে জানবে, তখন তারা উপহাস করার বদলে একজন সহানুভূতিশীল সহপাঠী, বন্ধু, ভাই বা পরবর্তীতে একজন দায়িত্বশীল সঙ্গী হতে পারবে।


প্রথম পিরিয়ড একটি মেয়ের জীবনে পরিবর্তনের অনেক বড় এক মুহূর্ত। কিন্তু সেটি যেন কোনো ভয়ের দিন হয়ে না থাকে। বরং সে যেন জানে—


“আমার শরীরে পরিবর্তন হচ্ছে। এটা স্বাভাবিক।”


“কিছু বুঝতে না পারলে আমি মাকে বলতে পারি।”


“স্কুলে হলেও আমি সামলাতে পারব।”


আর সবচেয়ে বড় কথা—


“পিরিয়ড হয়েছে বলে আমি অসুস্থ হয়ে যাইনি।”


সঠিক ও যথার্থ পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে এতোটুকু আত্মবিশ্বাস তার মধ্যে সহজেই এনে দেয়া সম্ভব। 


তথ্যসূত্র : ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (এসিওজি)

sidebar ad