মাইক্রোপ্লাস্টিকঃ আধুনিক জীবনের অদেখা বিপদ

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬

মাইক্রোপ্লাস্টিকঃ আধুনিক জীবনের অদেখা বিপদ

টুথপেস্ট থেকে শরীরে ঢুকছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, “সয়াবিন তেলেও মিললো মাইক্রোপ্লাস্টিক, “দেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পন্যে পাওয়া গেল মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি- এমন শিরোনাম যেন এখন প্রায়ই চোখে পড়ে আমাদের নিউজফিডে। একের পর এক গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে আসছে অদৃশ্য এই প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির খবর। খাবারের পাত থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যেও এই প্লাস্টিকের অস্তিত্ব, সত্যিই উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয়।


একসময় প্লাস্টিক দূষণের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত নদী-নালা, সমুদ্র কিংবা আবর্জনার স্তুপে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট এসবের দৃশ্য। সেই প্লাস্টিকই সময়ের সাথে সাথে ভেঙ্গে তৈরি করে অতি ক্ষুদ্র কণা, মাইক্রোপ্লাস্টিক। আর এই মাইক্রোপ্লাস্টিকই কিনা বিজ্ঞানীরা মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও এর উপস্থিতি শনাক্ত করছেন। ফলে বিষয়টি এখন জনস্বাস্থ্য নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।


কি এই মাইক্রোপ্লাস্টিক? এটি আমাদের শরীরে কিভাবে প্রবেশ করে? সত্যিই কি এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, নাকি সবকিছুই অতিরঞ্জিত? চলুন, বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক।


মাইক্রোপ্লাস্টিকের বেশ কয়েকটি সংজ্ঞা রয়েছে। তবে বহুল ব্যবহৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিক বা এমপি হল এমন প্লাটিক কণা, যার প্রস্থ ১ ন্যানোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটারের মধ্যে। এক ন্যানোমিটার হলো মানুষের চুলের প্রস্থের একটি ভগ্নাংশ মাত্র এবং ৫ মিলিমিটার হলো প্রায় একটি পেন্সিল ইরেজারের আকারের সমান।


মাইক্রোপ্লাস্টিক আসার উৎস:


জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচী (ইউএনইপি) এর বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার মাইক্রোপ্লাস্টিকের দুটি প্রধান উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন। কিছু প্লাস্টিক ছোট করে তৈরি করা হয়। এগুলো প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত। কারখানায় তৈরি পলিথিন প্লাস্টিকের অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা এই মাইক্রোবিডস ক্লিনজার এবং টুথপেস্টের মতো স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য পন্যে এক্সফোলিয়েন্ট হিসেবে যোগ করা হয়।


জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচীর মতে, প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যগুলোতে প্লাস্টিকের মাইক্রোবিডের প্রথম আবির্ভাব ঘটে, এবং তখন থেকেই প্রাকৃতিক উপাদানের জায়গায় প্লাস্টিকের ব্যবহার ক্রমশ বাড়তে থাকে। এমনকি ২০১২ সালেও এই বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ছিল। বাজারে প্লাস্টিকের মাইক্রোবিডযুক্ত পণ্যের প্রাচুর্য থাকলেও ভোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে তেমন সচেতনতা ছিল না। যদিও পরবর্তীতে ২০১৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘মাইক্রোবিড ফ্রি ওয়াটারস অ্যাক্ট অফ ২০১৫ এ স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে প্রসাধনী এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যগুলোতে প্লাস্টিকের মাইক্রোবিড নিষিদ্ধ করা হয়।


কিন্তু বেশিরভাগ মাইক্রোপ্লাস্টিক আসে বড় আকারের প্লাস্টিক পণ্যের ধীর পচনের ফলে, যার মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের মোড়ক, টেকঅ্যাওয়ে কন্টেইনার, পলিয়েস্টারের পোশাক, টায়ার, রঙ এবং কৃত্রিম ঘাস। এগুলো সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত।


সাম্প্রতিক গবেষণায় আমাদের দেশে টুথপেস্ট, সয়াবিন তেল, দুধ ও চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। এনভায়রমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)’র গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০ টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শণাক্ত হয়েছে। ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতেই মিলেছে অতি ক্ষুদ্র এই প্লাস্টিকের কণা। এর মধ্যে শিশুদের জন্য তৈরি ৬টির মধ্যে ৪টি রয়েছে এই তালিকায়। টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এই সামনে আসার পর মূলত এই ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনার জন্ম হয়। 


পরবর্তীতে খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজারটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।


এছাড়াও, প্রতি ১০ মিলিলিটার প্রসেসড দুধে গড়ে প্রায় ১৫৬ দশমিক ০৬ টি এবং কাঁচা দুধে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি কণা পাওয়া গেছে। চিনি প্রতি কেজি ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি ও খোলা চিনিতে ৪০৩টি কণা পাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকরা। 


এখন প্রশ্ন হলো এই মাইক্রোপ্লাস্টিক কিভাবে পরিবেশে প্রবেশ করে? আর কীভাবেই বা আমাদের খাবারে এই কণা প্রবেশ করছে?


ইউএনইপির বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক গার্ডনারের মতে, এটা সম্ভবত বলা যায় যে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব প্রায় সবখানেই আছে। এগুলো পানি, মাটি এবং বাতাসে পাওয়া যায়। একটি হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে ২৭ লক্ষ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে মিশে গিয়েছিল এবং ২০৪০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


এই মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে প্রবেশের বেশ কয়েকটি উপায় আছে। সময়ের সাথে সাথে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পণ্য ভেঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হতে পারে। পলিয়েস্টারের মতো সিন্থেটিক কাপড় ধোয়ার সময় মাইক্রোপ্লাস্টিকের আঁশ ঝরে পড়তে পারে। এছাড়াও, মানুষ যখন এই কণা মিশ্রিত পণ্য ব্যবহার করে, তখনও মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে নির্গত হয়।


তবে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কো্নো না কোনোভাবে পরিবেশে প্রবেশ করে এবং একবার সেখানে পৌঁছালে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে যে এই কণাগুলো মাটি, পানি, বরফ এমনকি বাতাসের মাধ্যমেও চলাচল করতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত যে, যখন এগুলো পরিবেশে এসে পৌঁছায়, তখন তা আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করে।  


গবেষকরা মনে করছেন, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং ও মোড়ক, কারখানার প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি ও পাইপলাইন এবং পরিবেশ দূষণ এই ৩টি প্রধান পথে খাবারে এই কণা মিশছে। শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, মেঘনা নদীর মাছের পাকস্থলীতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা খাদ্যশৃংখলের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।


মানবদেহের জন্য কতটা ঝুঁকি?


নিউ ইয়র্কের নিউ পাল্টজ ভিত্তিক ‘ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সায়েন্টিস্ট নেটওয়ার্ক অ্যাড্রেসিং প্লাস্টিকস অ্যান্ড হেলথ এর নির্বাহী পরিচালক মেগান উলফ এর মতে, প্লাস্টিকের সংস্পর্শ থেকে আমাদের নিস্তার নেই বললেই চলে। প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রানির তুলনায় মানুষের শরীরে এদের প্রবেশ বা সংস্পর্শের মাত্রা অনেক বেশি। বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ি, প্লাস্টিক উৎপাদনের পরিমাণ দ্বিগুণ হচ্ছে এবং এর ফলে প্লাস্টিক ভেঙ্গে আরও ক্ষুদ্র কণিকায় পরিণত হওয়ার ব্যাপক সুযোগ তৈরি হচ্ছে।


মাইক্রোপ্লাস্টিক,তা পরবর্তীতে ভেঙ্গে ন্যানোপ্লাস্টি্কে পরিণত হতে পারে, যার আকার ১ মাইক্রোমিটারের চেয়েও কম। এত ক্ষুদ্র পরিসরে, এই কণাগুলো কালি বা ধূলিকণার মতো অন্যান্য বস্তুকণার সাথে বাতাসের মধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পরে এবং রক্তনালীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মানবকোষে প্রবেশ করতে পারে।


যদিও প্লস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণাগুলোর অনেক কিছুই প্রচলিত শাণাক্তকরণ পদ্ধতির আওতার বাইরে থেকে গেছে, তবুও প্রযুক্তির প্রতিটি উন্নতির সাথে সাথে এদের আরও বেশি করে শাণাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।


এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য ক্ষতির যেসব প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা মূলত পরীক্ষাগারে কোষ বা কলার ওপর পরিচালিত পরীক্ষা এবং প্রাণীর ওপর করা গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পরীক্ষামূলক মডেলে দেখা গেছে যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানব ফুসফুস ও অন্ত্রের কোষীয় বাঁধা অতিক্রম করে রক্তপ্রবাহে এবং পরবর্তীতে প্রজনন অঙ্গ, প্লাসেন্টা ও মস্তিষ্কের মতো বিভিন্ন কলা বা টিস্যুতে পৌঁছাতে পারে। এছাড়াও, প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় এর সংস্পর্শে আসার সাথে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং প্রজননতন্ত্র ও হৃদযন্ত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষতিকর স্বাস্থ্যসমস্যার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।


চীনে গবেষণালব্ধ এক প্রতিবেদনেও এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে যে, মানুষের প্রজনন, পরিপাক ও শ্বসনতন্ত্রের স্বাস্থ্যের ক্ষতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি সম্ভাব্য ভূমিক রয়েছে এবং কোলন ও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধিতেও এর ভূমিকা  থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে সাথে এটাও যোগ করা হয়েছে যে, এই গবেষণালব্ধ ফলাফলগুলো সম্ভাব্য প্রভাবের কেবল একটি আংশিক চিত্রই তুলে ধরে।


পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ কমাতে করণীয়


গবেষকদের মতে, প্রথম পদক্ষেপ হলো কোম্পানিগুলোর পণ্যে অপ্রয়োজনীয় মাইক্রোপ্লাস্টিক যোগ করা বন্ধ করা। এছাড়াও, গুরুত্বপূর্ণ হলো পন্যগুলোকে এমনভাবে ডিজাইন করা, যাতে সেগুলোতে প্লাস্টিকের পরিমাণ ও প্লাস্টিক ফাইবার কম থাকে এবং ব্যবহারের শেষে তা পরিবেশে নির্গত না হয়। বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা জোরদার করা হলে প্লাস্টিক পণ্যের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া এবং সেগুলো ভেঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হওয়া বন্ধ করা সম্ভব হবে।


টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাইয়ের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসটিআই। সংস্থাটি জানায় কেবল কণা পাওয়া গেলেই তা ক্ষতিকর প্রমাণিত হয় না। তবে যে কোন পণ্য বাংলাদেশের মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে তা যদি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় তাহলে বিদ্যমান আইনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়। 

 

তথ্যসূত্রঃ


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)


জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইউএস ইপিএ)


ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ)

 

লেখা - শায়লা জাহান

sidebar ad